চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) শহরজুড়ে অপরাধ দমনে নতুন করে ৩৩০ জন চিহ্নিত দুষ্কৃতকারীর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রবেশ ও অবস্থান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হত্যা, দস্যুতা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি এবং হামলা-ভাঙচুরসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক পুলিশ কেস রেকর্ড (পিসিআর) রয়েছে। পুলিশের দাবি, এই ব্যক্তিরা নগরীর নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
শনিবার দুপুরে গণবিজ্ঞপ্তি আকারে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী পুলিশ কমিশনার তার ক্ষমতাবলে এই আদেশ জারি করেছেন। গণবিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে তালিকাভুক্ত দুষ্কৃতকারীদের মহানগর এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং তাদের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হলো। এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। গণবিজ্ঞপ্তির শেষে পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষর করেন এবং এর সঙ্গে ১২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত তালিকা সংযুক্ত রয়েছে।
সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি এখন থেকে চট্টগ্রাম শহরের সীমানায় প্রবেশ করতে পারবেন না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং শহরে ঢোকার চেষ্টা করলেই তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হবে।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই ৩৩০ জনের তালিকা কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে পলাতক এবং তাদের বিরুদ্ধে একাধিক পিসিআর রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তালিকাভুক্তদের চলাচল নিবিড়ভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। শহরে প্রবেশের সম্ভাব্য সকল পথেই অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। কেউ ছদ্মবেশে বা ভিন্ন পথে শহরে প্রবেশের চেষ্টা করলেও শনাক্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
ঐ কর্মকর্তা আরও উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং টানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধীরা শহরে প্রবেশ করতে না পারলে বড় ধরনের নাশকতার সুযোগও কমে যাবে। মানবাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা নয়। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনাই মূল লক্ষ্য। শহরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ মূলত একটি নিরাপত্তামূলক এবং সাময়িক ব্যবস্থা।
প্রকাশিত তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৩ থেকে ২৫টির মধ্যে। এদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগ ক্যাডার হেলাল আকবর চৌধুরী বাবার, আ.লীগের দিদারুল আলম মাসুম, সাইফুল ইসলাম রিমন, বর্তমানে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ, তার সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন, সন্ত্রাসী রায়হান, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক ছাত্রদল নেতা বার্মা সাইফুল, চট্টগ্রাম ১০ আসনের সাবেক আ.লীগের এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চু, সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন, যুবলীগের দেবাসিষ পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর, সাবেক সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমুসহ আরও অনেকে। তারা কেউ হত্যা, কেউ অস্ত্র মামলার আসামি। এছাড়া মাদক সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য, সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী দলের নেতা, রাজনৈতিক হামলা ও নাশকতা মামলার আসামি এবং চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি চক্রের পরিচিত সদস্যরাও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। তালিকায় বেশ কয়েকজন পুরোনো সন্ত্রাসীও আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক।
চট্টগ্রাম নগরীর ১৭টি প্রবেশপথে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসিয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মোবাইল ট্র্যাকিং, মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা (ফেসিয়াল রিকগনিশন) এবং বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে বিশেষ নজরদারি চলছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, শহরমুখী আন্তজেলা বাসগুলোতে আকস্মিক তল্লাশি চালানো হচ্ছে। কোনোভাবেই তারা চট্টগ্রামে ঢুকতে পারবে না।
রিপোর্টারের নাম 
























