ঢাকা ০৪:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে জাপানের খনিজ অনুসন্ধান: লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো

বিরল খনিজ সম্পদের জন্য চীনের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে এক উচ্চাভিলাষী অভিযান শুরু করেছে জাপান। গত সোমবার শিজুওকার শিমিজু বন্দর থেকে ‘চিকিউ’ নামক একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক খনন জাহাজ দূরবর্তী দ্বীপ মিনামি তোরিশিমার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের এই গভীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ সম্পদের মজুদ রয়েছে, যা জাপানের শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

মূলত বৈদ্যুতিক যান (ইভি), উইন্ড টারবাইন, হার্ড ড্রাইভ এবং এমনকি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য ১৭ ধরনের ধাতুকে ‘বিরল খনিজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈশ্বিক বাজারে এই খনিজ সরবরাহে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান ইস্যু এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কারণে বেইজিংয়ের সাথে টোকিও’র উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপান তার আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে, গত নভেম্বরে জাপানি নেতৃত্বের তাইওয়ান সফরের পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

জাপানের মন্ত্রিপরিষদ দপ্তরের কর্মসূচি পরিচালক শোইচি ইশি এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহের একটি টেকসই ও বৈচিত্র্যময় শৃঙ্খলা তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, খনিজ সম্পদের দেশীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা জাপানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এখন সময়ের দাবি।

গবেষণা সংস্থা ‘জ্যামস্টেক’-এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরে এই পরীক্ষামূলক খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বিশ্বে এ ধরনের প্রথম কোনো উদ্যোগ। মিনামি তোরিশিমা দ্বীপের আশপাশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি খনিজ মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। এর মধ্যে মোবাইল ফোন ও গাড়ির চুম্বকে ব্যবহৃত ‘ডিসপ্রোসিয়াম’ এবং লেজার প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ‘ইট্রিয়াম’-এর মতো মূল্যবান উপাদান রয়েছে, যা জাপানের কয়েকশ বছরের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

গবেষক মহলের মতে, এই অভিযান সফল হলে জাপানের শিল্প খাতের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। গবেষক তাকাহিরো কামিসুনা উল্লেখ করেন, নিয়মিত উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে চীনের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

উল্লেখ্য, চীন সম্প্রতি জাপানের কাছে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য কিছু ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান এই খনিজ অনুসন্ধান অভিযান জাপানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন জাপানের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে জাপানের খনিজ অনুসন্ধান: লক্ষ্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো

আপডেট সময় : ০১:১৪:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বিরল খনিজ সম্পদের জন্য চীনের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে এক উচ্চাভিলাষী অভিযান শুরু করেছে জাপান। গত সোমবার শিজুওকার শিমিজু বন্দর থেকে ‘চিকিউ’ নামক একটি অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক খনন জাহাজ দূরবর্তী দ্বীপ মিনামি তোরিশিমার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের এই গভীর তলদেশে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ সম্পদের মজুদ রয়েছে, যা জাপানের শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

মূলত বৈদ্যুতিক যান (ইভি), উইন্ড টারবাইন, হার্ড ড্রাইভ এবং এমনকি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য অপরিহার্য ১৭ ধরনের ধাতুকে ‘বিরল খনিজ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈশ্বিক বাজারে এই খনিজ সরবরাহে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাইওয়ান ইস্যু এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কারণে বেইজিংয়ের সাথে টোকিও’র উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জাপান তার আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে, গত নভেম্বরে জাপানি নেতৃত্বের তাইওয়ান সফরের পর থেকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়।

জাপানের মন্ত্রিপরিষদ দপ্তরের কর্মসূচি পরিচালক শোইচি ইশি এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, নির্দিষ্ট কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সরবরাহের একটি টেকসই ও বৈচিত্র্যময় শৃঙ্খলা তৈরি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, খনিজ সম্পদের দেশীয় উৎপাদন নিশ্চিত করা জাপানের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এখন সময়ের দাবি।

গবেষণা সংস্থা ‘জ্যামস্টেক’-এর তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীরে এই পরীক্ষামূলক খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, যা বিশ্বে এ ধরনের প্রথম কোনো উদ্যোগ। মিনামি তোরিশিমা দ্বীপের আশপাশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টনের বেশি খনিজ মজুদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। এর মধ্যে মোবাইল ফোন ও গাড়ির চুম্বকে ব্যবহৃত ‘ডিসপ্রোসিয়াম’ এবং লেজার প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ‘ইট্রিয়াম’-এর মতো মূল্যবান উপাদান রয়েছে, যা জাপানের কয়েকশ বছরের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

গবেষক মহলের মতে, এই অভিযান সফল হলে জাপানের শিল্প খাতের জন্য একটি নিরাপদ ও শক্তিশালী দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। গবেষক তাকাহিরো কামিসুনা উল্লেখ করেন, নিয়মিত উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে চীনের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।

উল্লেখ্য, চীন সম্প্রতি জাপানের কাছে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য কিছু ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান এই খনিজ অনুসন্ধান অভিযান জাপানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন জাপানের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।