আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের শিকার হয়ে দেশের অধিকাংশ নন-ব্যাংক ফাইন্যান্স কোম্পানি বর্তমানে চরম অর্থসংকটে পড়েছে। ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর সব মূলধন ক্ষয় হয়ে গেছে এবং সম্পদের মান কমে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, লুটপাটের ক্ষত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর গড় হিসাবে এখন সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ অনেক বেশি। বর্তমানে প্রতি ১০০ টাকার সম্পদের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছে দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ টাকা। এর অর্থ হলো, প্রতিষ্ঠানগুলোর সমুদয় সম্পদ বিক্রি করেও আমানতকারীদের পাওনা বা দায় মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত সরকারের আমলে পি কে হালদার একাই পাঁচটি ফাইন্যান্স কোম্পানিকে দেউলিয়া করে গেছেন এবং এস আলম গ্রুপ আরও দুটি কোম্পানিতে লুটপাট চালিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হওয়ায় অন্তত ১৩টি কোম্পানির প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ফলে খেলাপি ঋণ পাগলা ঘোড়ার গতিতে বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ২০ হাজার কোটি টাকা থাকলেও গত জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৮০ শতাংশই এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে পরিণত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৬১ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় এই অর্থ আদায়ের সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ।
আর্থিক খাতের এই ভয়াবহ চিত্রের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন পরিস্থিতি নেতিবাচক বা ‘নেগেটিভ’ হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে ৩৫টি ফাইন্যান্স কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক মূলধন ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাকি ২১টি কোম্পানি মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে, যার মধ্যে ১১টির কোনো মূলধনই অবশিষ্ট নেই। এই সংকটের মুখে ৯টি কোম্পানিকে বন্ধ করে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে কোম্পানিগুলোর কোনো আয় নেই এবং বিনিয়োগ থেকেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত জুনে এ খাতে লোকসানের হার ছিল ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই অর্থশূন্য হয়ে পড়ছে এবং অনেক কোম্পানি আমানতকারীদের গচ্ছিত টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
বর্তমানে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে আমানতের পরিমাণ ৫২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা হলেও অন্যান্য সব দায় মিলিয়ে মোট দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিশাল দায়ের বিপরীতে সমপরিমাণ সম্পদ নেই এবং যা আছে তার ৯১ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। নগদ অর্থের সংকট এতটাই প্রকট যে, কোম্পানিগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর) রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভয়াবহ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোকাবিলা করা এবং আমানতকারীদের পাওনা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























