ঢাকা ০৮:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতি এখন ব্যবসা, প্রতিপক্ষ মরণশীল শত্রু: গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমূল পরিবর্তনের ডাক বদিউলের

খুলনা, ১০ জানুয়ারি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয়েছে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনীতিবিদরা একে অপরের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে এখন মরণশীল শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতি এখন বহুলাংশে ব্যবসায়ে পরিণত হওয়ায় অর্থ ও পেশিশক্তিই এর চালিকাশক্তি। শনিবার (১০ জানুয়ারি) খুলনায় ‘জুলাই অভ্যুত্থান আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে প্রধান আলোচকের বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

সংলাপে ড. মজুমদার জানান, ‘জুলাই সনদ’-এর ৮৬টি বিষয়ে ঐকমত্য হলেও কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমত রয়েছে। ঐকমত্য হওয়া ৮৬টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত, যা গণভোটে উত্থাপন করা হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এই ৪৮টি বিষয় সমন্বিত একটি প্যাকেজ হিসেবে পাস হবে এবং সংবিধান সংশোধনের পথ সুগম হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে না, বা গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে না। এর জন্য প্রয়োজন সব নাগরিক, বিশেষত রাজনীতিবিদদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা, যার চরম অবক্ষয় ঘটেছে গত কয়েক দশকে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই অবক্ষয়ের ফলস্বরূপ রাজনীতি এখন নীতি-আদর্শের পরিবর্তে কালো টাকা, হুন্ডা-গুন্ডা ও সহিংসতার ভাষায় কথা বলছে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি জন্ম নিচ্ছে, যা সমাজকে মারাত্মকভাবে বিভাজিত করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের বৈধ সরকারি ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন করছে। তাই টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য।

সংলাপে অংশ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও ড. মজুমদারের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করেন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে জোর দেন।

খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সুজনের এই আয়োজনকে গঠনমূলক উল্লেখ করে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন’-এর মাধ্যমে আমরা এক নতুন যাত্রা শুরু করেছি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এবার সংঘাতবিহীন ও নগ্নতামুক্ত নির্বাচন হবে। বিদায়ী দল না থাকায় ‘মারমার কাটকাট’ পরিস্থিতি নেই, যা নির্বাচনের উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মঞ্জু জানান, ‘জুলাই সনদে’র বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে বিএনপি প্রস্তুত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকা সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

খুলনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল বলেন, ‘জুলাই সনদ’ বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে আমরা প্রচার শুরু করেছি এবং দলীয় প্রতীকের প্রচারের পাশাপাশি এই বিষয়েও জোর দেওয়া হবে। তিনি আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেন। এছাড়া, নির্বাচনের ব্যয়সীমা ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে জামায়াতের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, তাদের নারী সদস্য ৩০ শতাংশের বেশি এবং ভবিষ্যৎ সংসদ সদস্য তৈরির লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নারীদের প্রার্থী করা হচ্ছে।

খুলনা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহফুজ রহমান ‘জুলাই’ আন্দোলনের প্রশংসা করে বলেন, ‘জুলাই’ না হলে তিনি আজ এখানে কথা বলতে পারতেন না। তিনি বলেন, এ জাতি আর কোনো বৈষম্য, গুম, খুন বা বঞ্চনা দেখতে চায় না; তারা ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চলমান খুন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনাচার বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি দৃশ্যমান বিচার, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জরুরি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মাহফুজ রহমান ‘জুলাই সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে নির্বাচন ভালো হবে না বলে সতর্ক করেন। তিনি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তরায়গুলো কঠোর হস্তে দমনের দাবি জানান।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান রাজধানীতে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ, সীমান্তে চরম উত্তেজনা

রাজনীতি এখন ব্যবসা, প্রতিপক্ষ মরণশীল শত্রু: গণতান্ত্রিক উত্তরণে আমূল পরিবর্তনের ডাক বদিউলের

আপডেট সময় : ০৩:০৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

খুলনা, ১০ জানুয়ারি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হয়েছে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনীতিবিদরা একে অপরের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে এখন মরণশীল শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতি এখন বহুলাংশে ব্যবসায়ে পরিণত হওয়ায় অর্থ ও পেশিশক্তিই এর চালিকাশক্তি। শনিবার (১০ জানুয়ারি) খুলনায় ‘জুলাই অভ্যুত্থান আকাঙ্ক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে প্রধান আলোচকের বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

সংলাপে ড. মজুমদার জানান, ‘জুলাই সনদ’-এর ৮৬টি বিষয়ে ঐকমত্য হলেও কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমত রয়েছে। ঐকমত্য হওয়া ৮৬টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত, যা গণভোটে উত্থাপন করা হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে এই ৪৮টি বিষয় সমন্বিত একটি প্যাকেজ হিসেবে পাস হবে এবং সংবিধান সংশোধনের পথ সুগম হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে না, বা গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটবে না। এর জন্য প্রয়োজন সব নাগরিক, বিশেষত রাজনীতিবিদদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা, যার চরম অবক্ষয় ঘটেছে গত কয়েক দশকে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই অবক্ষয়ের ফলস্বরূপ রাজনীতি এখন নীতি-আদর্শের পরিবর্তে কালো টাকা, হুন্ডা-গুন্ডা ও সহিংসতার ভাষায় কথা বলছে। এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি জন্ম নিচ্ছে, যা সমাজকে মারাত্মকভাবে বিভাজিত করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের বৈধ সরকারি ক্ষমতা অবৈধভাবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন করছে। তাই টেকসই গণতন্ত্রের জন্য সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য।

সংলাপে অংশ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও ড. মজুমদারের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করেন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে জোর দেন।

খুলনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সুজনের এই আয়োজনকে গঠনমূলক উল্লেখ করে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন’-এর মাধ্যমে আমরা এক নতুন যাত্রা শুরু করেছি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এবার সংঘাতবিহীন ও নগ্নতামুক্ত নির্বাচন হবে। বিদায়ী দল না থাকায় ‘মারমার কাটকাট’ পরিস্থিতি নেই, যা নির্বাচনের উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মঞ্জু জানান, ‘জুলাই সনদে’র বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে বিএনপি প্রস্তুত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকা সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে তিনি সুশাসন ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

খুলনা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল বলেন, ‘জুলাই সনদ’ বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে আমরা প্রচার শুরু করেছি এবং দলীয় প্রতীকের প্রচারের পাশাপাশি এই বিষয়েও জোর দেওয়া হবে। তিনি আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেন। এছাড়া, নির্বাচনের ব্যয়সীমা ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেন। নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে জামায়াতের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, তাদের নারী সদস্য ৩০ শতাংশের বেশি এবং ভবিষ্যৎ সংসদ সদস্য তৈরির লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে নারীদের প্রার্থী করা হচ্ছে।

খুলনা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহফুজ রহমান ‘জুলাই’ আন্দোলনের প্রশংসা করে বলেন, ‘জুলাই’ না হলে তিনি আজ এখানে কথা বলতে পারতেন না। তিনি বলেন, এ জাতি আর কোনো বৈষম্য, গুম, খুন বা বঞ্চনা দেখতে চায় না; তারা ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চলমান খুন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনাচার বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি দৃশ্যমান বিচার, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জরুরি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মাহফুজ রহমান ‘জুলাই সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না হলে নির্বাচন ভালো হবে না বলে সতর্ক করেন। তিনি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তরায়গুলো কঠোর হস্তে দমনের দাবি জানান।