ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী আড়াই হাজার প্রার্থীর জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অধিকাংশ ব্যক্তিগত জীবনে দামি গাড়ি ও বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলেও হলফনামার কাগজে তারা নিজেদের ‘স্বল্পবিত্ত’ বা প্রায় দরিদ্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অনেক প্রার্থীর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৬ লাখ টাকা, অথচ বিধি অনুযায়ী একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ই হতে পারে ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। নিজের আয়ের চেয়ে নির্বাচনী ব্যয় বেশি হওয়ার এই রহস্য নিয়ে সাধারণ ভোটার ও বিশ্লেষকদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের আয় ৪ লাখ টাকা এবং এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের আয় ১৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন বিএনপির আব্দুল আউয়াল মিন্টু, যার বার্ষিক আয় কেবল অকৃষি জমি থেকেই ৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। আশ্চর্যজনক তথ্য হলো, ঢাকা-১২ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মাসিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৮,৫০০ টাকার কম। বিশ্লেষকদের মতে, কর ফাঁকি দেওয়া, আইনি জটিলতা এড়ানো এবং ভোটারদের কাছে ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে ভাবমূর্তি গড়ার লক্ষ্যেই প্রার্থীরা আয় কমিয়ে দেখাচ্ছেন।
হলফনামায় তথ্য গোপনের মূল কারণসমূহ:
- কর ফাঁকি: আয়কর নথির সাথে মিল রাখতে গিয়ে প্রকৃত আয়ের ক্ষুদ্র অংশ প্রদর্শন।
- ব্যয়ের উৎস গোপন: নির্বাচনী প্রচারে বিপুল খরচের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন এড়ানো।
- পরিবারের নামে সম্পদ: নিজের নামে সম্পদ না রেখে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে হাজার গুণ সম্পদ বৃদ্ধি।
- আইনের দুর্বলতা: হলফনামার তথ্য যাচাইয়ে এনবিআর ও নির্বাচন কমিশনের কার্যকর সমন্বয়ের অভাব।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও সুজন-এর নেতৃবৃন্দ মনে করেন, হলফনামা এখন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আয়কর নথি ও হলফনামার তথ্যে গরমিল থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা রিটার্নিং কর্মকর্তারা তা গুরুত্ব সহকারে যাচাই করছেন না। যদিও আরপিও অনুযায়ী অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে, কিন্তু জনবল সংকট ও সদিচ্ছার অভাবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নির্বাচনী ব্যয়ের অডিট বা নিরীক্ষা না হওয়ায় প্রার্থীরা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৫-৬ গুণ বেশি টাকা খরচ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।
রিপোর্টারের নাম 

























