৫
৮ নভেম্বর ১৯৮৭, সন্ধ্যা ৬টা ১৭
তোমার কান দুটো খাড়া হয়ে আছে, মোকাম। খুব সতর্ক হয়ে আছ তুমি। ধারেকাছেই কোথা থেকে যেন মিহি, কিন্তু ছন্দোবদ্ধ ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…আওয়াজ তোমার কানের পর্দায় এসে ধাক্কা মারছে। তুমি আবারও এসে দাঁড়িয়েছ টিলার ওপরে, সে কৃষ্ণচূড়াগাছের নিচে। চরাচর এখনো কুয়াশায় আচ্ছন্ন। তুমি সাঁতার কাটার মতো হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে চেষ্টা করো কুয়াশা সরিয়ে আশপাশের দৃশ্যপট পরিষ্কার করার। এভাবে তোমার ক্রমাগত লাফালাফিতে অথবা হয়তো নিজ থেকেই চারপাশের কুয়াশা পাতলা হয়ে আসে। তোমার চোখে ভেসে ওঠে এক বাড়ির অবয়ব।
দিনের কোন অংশে দাঁড়িয়ে আছ তুমি? কেমন যেন এক চাপা অন্ধকার চারপাশে। যেন সাঁঝবেলা কিংবা ভোর হয় হয়। চাপা আঁধারের মাঝেও দেখা যাচ্ছে বাড়িটার পেছনে ছোটবেলার ড্রয়িং পরীক্ষায় আঁকা ছবির মতো দুটো নারকেলগাছ। সটান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ দুটোর সব পাতা পুড়ে ছাই হয়ে আছে। বাজ পড়েছিল ওদের মাথায় কিংবা আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কেউ? কিন্তু দেখো, গাছ দুটো এখনো দাঁড়িয়ে আছে নেহাত বেয়াদবের মতো, ঠং ঠঙা ঠং ঠং। তুমি মনে মনে তারিফ করো ন্যাড়া গাছ দুটোর মেরুদণ্ডের। তোমার আবছা আবছা মনে পড়ে, তোমার শৈশবে বাড়ির পেছনেও ঠিক এমন দুটো নারকেলগাছ ছিল। এ কি তোমার শৈশবের সেই নিবাস, মোকাম?
ওই তো, ইট দিয়ে বাঁধাই করা সবুজ উঠোনে একগাদা ফুলের চারা। তাতে ফুটে আছে গাঁদা, টগর, রঙ্গন, রজনীগন্ধা। এ ফুলগুলোই তো ছেলেবেলায় তোমাদের বাড়ির উঠোনে ফুটে থাকত। পাশে একটা ইজিচেয়ার, তার ওপর আলগোছে ফেলে রাখা দৈনিক ইন্তেজার। যেন তোমার বাবা মাত্রই পত্রিকা পড়া শেষ করে উঠে গেছেন কোথাও। উঠোনের এক পাশে, গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তোমার রমিজ কাকুর বিশাল বিশাল চাকাওয়ালা সাইকেল। নিশ্চয়ই এটা সেই বাড়ি, যেখানে কেটেছে তোমার শৈশব। নিশ্চয়ই…
বাতাস বইছে না একদম। ফুলগাছগুলোর শাখাপ্রশাখায় কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ে না। নিষ্প্রাণ, নির্জীব। কেমন যেন নুয়ে আছে, সেজদার ভঙ্গিতে।
ওই শোনো, মোকাম, সবকিছু ছাপিয়ে, ওই যে এক ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, টের পাচ্ছ তুমি? ওই তো, ওই যে, ভালো করে খেয়াল করো, কুয়াশার জাল সরিয়ে, বাড়ির আঙিনায় ওই দেখা যাচ্ছে একটা দোলনা। হ্যাঁ, করো, চোখ আরও সরু করে দেখো। দোলনা না? দোলনাই তো। কেউ কি বসা ওতে? ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…কে বসা ওতে? ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ফ্রক পরা, ১০-১২ বছর বয়সী মেয়ে না একটা? ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…তার লম্বা মসৃণ পা দুটো উদাম?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…তা এতটা তৈলাক্ত, এতটা চকচকে কেন?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…এত কুয়াশা আর ঠান্ডা, মেয়েটার কি শীত লাগে না?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…মাথা একটু সামনে ঝুঁকিয়ে রেখেছে ও, চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ায় চেহারা ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ওই লোকটা…ওই লোকটা…কে?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…কোথা থেকে এল?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…বাড়ির ভেতর থেকে, নাকি বাগানেই কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল এতক্ষণ?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…কে এই লোক, যার দাঁতের পাটি ছুরির ফলার মতো ঝকঝক করছে এই আলো-আঁধারিতেও? কেন সে হারামজাদা পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে দোলনার পিছে?…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…ক্যাঁচ…কেন সে ধাক্কা দিচ্ছে দোলনায়, আস্তে আস্তে?…ক্যাঁঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাচ…মোকাম, মোকাম, চুল কি সরে গেল মেয়েটার মুখের ওপর থেকে? ও কি…ও কি মৌলী নয়?…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাচ…অবশ্যই, অবশ্যই মৌলী। হাসছে কেন মৌলী? ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…মোকাম! মোকাম! লোকটার হাত মৌলীর কাঁধে কেন, মোকাম? মৌলীই-বা কেন একঝটকায় সে হাত সরিয়ে দিচ্ছে না? মৌলী হাসছে কেন, মোকাম?…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁচঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…মোকাম! লোকটা মৌলীর মসৃণ পায়ে হাত বোলাচ্ছে, মোকাম! কেন বোলাচ্ছে মোকাম! মৌলী…মৌলী চিৎকার করছে না কেন? সাহায্য চাইছে না কেন?…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…
তোমার কি দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছে? তুমি কি সইতে পারছ না বলে চোখ বন্ধ করে নিলে? চোখ খোলো মোকাম, ওই দেখো, মৌলীর কাঁধে হাত রেখে লোকটা মৌলীকে নিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সিঁড়িঘরের আঁধারে…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…
তুমি কী করবে এখন, মোকাম? ছুটবে লোকটার পিছু পিছু? কিন্তু…কিন্তু…মৌলী তো হাসছিল। মৌলীর চেহারায় তো কোনো অভিযোগের ছাপ ছিল না। তবু তুমি ছুটবে লোকটার পিছু পিছু? বুকের মাঝে পাথরের মতো ভার হয়ে থাকা যে বেদনা, তুমি তো জানো যে পুঁজি হিসেবে এর মূল্য দুকড়িও নয়। তুমি তো সহিংসও নও। আজ পর্যন্ত জীবনের কোনো সমস্যার সমাধানে সহিংসতার পথ বেছে নাওনি কখনো। সবকিছু সয়ে গেছ নীরবে। হ্যাঁ, তোমার কথাই বলছি, মোকাম। তুমিই তো মোকাম। মোকাম মাহমুদ। ধুলা ঝেড়ো না, আর ধুলা ঝেড়ো না। দোলনা এখনো দুলছে, দুলতে থাকুক।
ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…
ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…
ক্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যাচ…
মোকামের ঘোর ভেঙে যায়। চোখ খুলে আবিষ্কার করে, সে দাঁড়িয়ে আছে টাইগারপাড়ায়, তাদের বাড়ির সদর দরজায়।
***
পোস্তগোলা-হাসনাবাদ লিঙ্ক রোড হতে ৩০ ফিটের যে রাস্তাটা বাম দিকে বেঁকে গেছে, তার শেষ মাথায় টাইগারপাড়া। আর তার শেষে বুড়িগঙ্গা নদী। জায়গাটা না শহর, না গ্রাম। মফস্বল বলাই ঠিক হবে। পৈতৃক নিবাস না থাকলে এ মহল্লায় সবাই মুসাফিরের মতোই আসে, থাকে, চলে যায়। শিক্ষিত মানুষের জীবিকার সংস্থান নেই এখানে। স্কুল-কলেজের পড়াশোনাকে যারা গুরুত্ব দেয়নি জীবনে, তারা এখানে এটা-সেটা ব্যবসা করে টিকে আছে। এ ছাড়া জায়গাটা নদীর কোল ঘেঁষে হওয়ায় মাটি উর্বর। মহল্লার একদম মুখেই যে কাঁচাবাজার, তাতে বিক্রি হওয়া শাকসবজি-ফলমূলের প্রায় সবটুকুই স্থানীয়। আশপাশে চাষ করা খেত থেকে উঠিয়ে আনা। একদম গরিব যারা, তারা চাষবাস করে সরকারি খাসজমিতে। কাঁচাবাজারের দোকানিদের ফজরের আগে আগে ঢাকার ভেতরের কোনো আড়ত থেকে শাকসবজি কিনে নিয়ে আসা লাগে না বলে এ মহল্লার বাজার বসেও প্রতিদিন একটু ঢিমে লয়ে। যে যেই শাকসবজিটা চাষ করে, ভ্যান বা টুকরিতে করে সেটাই হেলেদুলে নিয়ে এসে বসে বাজারে। এই করতে করতে বাজার জমে উঠতে সকাল আটটা-সাড়ে আটটা বেজে যায়, চলে সারা দিন। বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টাইগারপাড়ার মানুষজনের দিনও শুরু হয় ঢিলেঢালা অবস্থায়। কেবল মাছবাজারিরা ভোরবেলা হয় শনির আখড়ার আড়ত থেকে বা মাসে একবার বা দুবার গিয়ে ঢাকা-চিটাগাং হাইওয়েতে মেঘনার কাছাকাছি যে মাছের আড়তগুলো আছে, তার কোনো একটা থেকে মাছ নিয়ে আসে। মেঘনার মাছ যেদিন বাজারে আসে, সেদিন টাইগারপাড়ার মৎস্যপ্রেমীরা ঘুম থেকে সকাল সকাল ছুটে এসে হাজির হয় মাছবাজারে।
কাঁচাবাজারের একদম লাগোয়া দুটো সেলুন। পুরোনো সেলুনের নাম নিউ বোম্বে সেলুন। আর অপেক্ষাকৃত নতুনটার নাম নিউ রেনেসাঁ হেয়ার ড্রেসিং। সেলুন দুটো পার করে মহল্লার সবচেয়ে পুরোনো দোকান লাইজু ডিসপেনসারি। ডিসপেনসারি পেরোলে পানের ছোট একটা টং। তারপর একটা চা-পুরি-শিঙাড়ার দোকান। পান-বিড়ি-চা-পুরির দোকান পেরিয়ে দুটো বড় জেনারেল স্টোর। এর মধ্যে সালেহ জেনারেল স্টোরে গিয়ে মোকামের বড় চাচা প্রায়ই বসে এবং এটার বেচাবিক্রি অনেক বেশি। অপর দোকানটা চালায় নাজমুল। নাজমুল আগে সালেহ মিয়ার দোকানেই কাজ করত। কিছু অর্থ আর অভিজ্ঞতা পুঁজি করে, সালেহ মিয়াকে কদমবুসি করে আলাদা আরেকটা দোকান দিয়েছে নিজে। আর বাজারের একদম ভেতরে, টাইগারপাড়ার বাড়িঘরগুলোর একদম লাগোয়া দোকানটি হলো পারভেজের স্টেশনারি শপ। এইটুকু পার করলেই টাইগারপাড়ার জনবসতি শুরু।
পাড়ায় ঢুকতেই প্রথম যে একতলা টিনের চালের পাকা বাড়ি, এটা হলো টাইগারপাড়া কল্যাণ সমিতি। পাড়ার পুরুষেরা এই সমিতিতে বসে রাত দু-তিন প্রহর পর্যন্ত তাস পেটায়, জুয়া খেলে আর বাংলায় চুমুক দেয়। সমিতির দৃশ্যমান কাজের মধ্যে আছে বছরে একবার পিকনিকের আয়োজন, ঈদে মিলাদুন্নবি (সা.)-এ মিলাদ পড়ানো-মিষ্টি বিতরণ, আর বছরে একবার টাইগারপাড়ার অধিবাসীদের মধ্যে শীতকালীন স্পোর্টসের আয়োজন করা—যেখানে ছেলেরা ক্যারম আর দাবা, আর মেয়েরা লুডু আর বালিশ নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রতি দুবছর অন্তর অন্তর মহল্লার সব মানুষ খুব আনন্দঘন পরিবেশে টাইগারপাড়া কল্যাণ সমিতির নির্বাচন করে। এবং ‘৭৫-এর পর গত বারো বছর ধরে প্রতিবারই মৌলীর আব্বা, অর্থাৎ বড় চাচা কীভাবে যেন সে নির্বাচনে সভাপতির পদে জিতে যায়। কল্যাণ সমিতি পার করে একটা বড় কৃষ্ণচূড়াগাছ, আর সে গাছের পরই মোকামদের বাড়ির বাউন্ডারি শুরু।
বাজারে এসে পা রাখামাত্র মোকাম গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি টের পেয়েছিল। বাজারটা পেরিয়ে মহল্লায় ঢুকতে পা চালাচ্ছিল দ্রুত। মনের ভেতর তখনো থেকে থেকে চোরকাঁটার মতো ঘাই দিচ্ছিল মুড়ির টিনে এরশাদের পক্ষ নেওয়া মানুষগুলো। দেশে এনট্রপি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আজ হোক অথবা আগামীকাল—এরশাদের পতন হবেই। এ ভবিতব্য বদলানোর নয়। অথচ এমন এক অস্থির সময়েও দেশের মানুষ কী অদ্ভুতভাবে বিভক্ত! বিশেষ করে মুরব্বি গোছের লোকজন যেভাবে এখনো এরশাদকে বুকের মাঝে ধরে রেখেছে, তা ভেবেই বিরক্তিতে বিষিয়ে ছিল মোকামের মন।
এসব ভাবতে ভাবতে দ্রুত পা চালাচ্ছিল সে। ঠিক তখন বাজারের তিনটি কুকুর দাঁত খিঁচিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তার দিকে ছুটে আসে। মোকামের মরমে মরণের দশা। যেকোনো এলাকাকে আপন মনে করবার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয় এই কুকুরগুলো। যদি মহল্লার কুত্তারা কাউকে চেনে, তবে সে প্রকৃত অর্থেই সেই মহল্লার অধিবাসী। জন্মের পর থেকে যে মহল্লায় বড় হওয়া, সে মহল্লার গলির কুকুর তাকে তাড়া করায় সে সাংঘাতিক কষ্ট পায়। অবশেষে তার ছোটা আরম্ভ করতে হয়। ছুটতে ছুটতেই হঠাৎ তার চেতনা বিলুপ্ত হয়, সে ঘোরের মাঝে প্রবেশ করে। ঘোর কেটে গেলে সে দেখতে পায়, সে দাঁড়িয়ে আছে তার বাড়ির গেটে।
এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেছে কখন যেন। আঁধারে পুরো বাড়িটা ঝিম মেরে আছে। বাউন্ডারির বাইরে থেকে ভেতরের কোনো কোনো কামরায় আবছা আলো দেখা যায়। বাউন্ডারি লাগোয়া সদর দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দিয়ে আটকানো। তবে বাড়ির বাসিন্দারা জানে, রাত ১১টার আগে এর সদর দরজায় তালা লাগানো হয় না। ছোট্ট একটা ফোকর আছে, দরজার মাঝবরাবর। ভেতরে, ঠিক তার নিচে ছিটকিনিটা। চাইলে ওই ফোকর দিয়ে হাত গলিয়ে ছিটকিনি খুলে ফেলা যায়। মোকাম সেটাই করে। ছিটকিনি খুলে বাড়ির আঙিনায় পা রাখে। তারপর খুব সাবধানে ছোট ছোট পা ফেলে এগোয়, যেন পা পিছলে আছাড় খেয়ে পড়া না লাগে। সিঁড়িগেটের কাছাকাছি আসতেই অপরিচিত এক আওয়াজ এসে তার কানে আঘাত করে।
মোকামের চোখ ওপরের তলার এদিক-সেদিক ঘুরে সেঁটে যায় মৌলীর বারান্দায়, যেমন করে মধুর ওপর চটকে আটকে যায় মাছি। বারান্দা আর ভেতরের কামরা আড়াল করে রাখা একটা নরম পর্দা, মেঝেতে রাখা হারিকেনের আলোয় পর্দার ওপাশে ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে আছে এক রমণোপযোগী নারীশরীর। সে শরীর ঝুঁকে আছে একপাশে। ছেড়ে রাখা চুল গামছা দিয়ে ঝাড়ছে। ওটা কি মৌলী? তার বড় চাচার মেয়ে? হেলে থাকা মৌলীর স্তনের গড়ন পর্দার ওপাশ থেকে একদম নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। সুডৌল বস্তুটির শীর্ষবৃন্ত পর্যন্ত আলাদা করে বোঝা যায়। মোকামের কাতর দৃষ্টি মধুতে হাবুডুবু খেতে থাকা মাছির মতোই ঘুরপাক খেতে থাকে পর্দার শরীরজুড়ে। অন্যদিকে ভেতরের নারীশরীর মোচড়াতে থাকে নানা ভঙ্গিমায়। পর্দার পেছন থেকে আসা আলোর সঙ্গে ভেদ সৃষ্টিকারী শরীরের বাঁকগুলো বারবার নির্মমভাবে ফুটে ওঠে। ধারালো চিবুক, মসৃণ কাঁধ, স্ফীত স্তন, ছিপছিপে কোমর, ভারী নিতম্ব। মোকামের মনে হয়, তার এভাবে তাকিয়ে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। তবু সে ফেরাতে পারে না নিজেকে। ভেতরে-ভেতরে অপরাধবোধ তাকে ঘুণপোকার মতো কুটকুট করে কামড় দিতে থাকে। কিন্তু সে অপরাধবোধের বিষদাঁত নেই। তার কামড় মোকামকে এই নেশা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। খানিক পর ভেতরে ছায়ার নড়নচড়নে বোঝা যায়, মৌলী প্রস্তুতি নিচ্ছে বারান্দায় আসার। শরীরের ওপর একটা কামিজ গলিয়ে দেয় মৌলী। তারপর গামছা হাতে করে বারান্দায় আসবে, ঠিক এমন সময় মহল্লায় বিদ্যুৎ ফিরে আসে। মোকাম চমকে ওঠে। মৌলী এখন বেরিয়ে এলেই তার চুরি ধরা পড়ে যাবে। সে ঝটপট ঢুকে পড়ে সিঁড়িগেটে। তার বুক ধুকপুক ধুকপুক করতে থাকে। মনে হয়, যেন সময়ের প্রবাহ থেমে গেছে চিরতরে। মোকাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেই সিঁড়িগেটের টিমটিম করে জ্বলতে থাকা বাল্বের হলদে কমলা আলো বৃষ্টিতে ভেজা আঙিনার সবুজ ঘাসের শরীরে পিছলে পিছলে যায়। ভেজা ঘাসের মসৃণতা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে সে যে মসৃণতা পর্দার আড়ালে দেখল, তার কোনো তুলনা হয় কি?
কয়েক মুহূর্ত পর মোকাম আবারও বেরিয়ে আসে পায়ে পায়ে। ভাবখানা এমন, যেন তার পকেট থেকে কিছু পড়ে গেছে উঠোনে। সেটাই খুঁজতে এসেছে সে। এই করতে করতেই সে আড়চোখে আরও একবার তাকায় মৌলীর বারান্দায়। বিদ্যুৎ আসার পর মৌলী বা মৌলীর ছায়া আর কোথাও দেখা যায় না। শূন্য বারান্দায় কেবল মৌলীর ভেজা গামছাটি ভেজা শীতের রাতের বিষণ্নতাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে ঝুলে আছে। মৌলীর শরীরের স্পর্শ পাওয়া সে টুকটুকে লাল গামছার দিকে তাকিয়ে মোকামের শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে। ছোট একটা শ্বাস ফেলে সে পুনরায় পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে সিঁড়িঘরের দিকে, একতলায়, তার কামরায়। ঠিক তখনই সে খেয়াল করে, তার কামরায় আলো জ্বলছে। জানালা খোলা, তা দিয়ে ভেসে আসছে ভেতরের ফ্যান ঘুরবার শোঁ শোঁ আওয়াজ। জানালার পর্দা নৌকার পালের মতো ফুলেফেঁপে উঠছে। মোকাম এক শতে এক শ ভাগ নিশ্চিত, সকালে বেরোবার সময় তার কামরার প্রতিটা লাইট-ফ্যানের সুইচ বন্ধ ছিল। শীতকাল এখন। দিনের বেলা লাইট জ্বালানো লাগে না, ফ্যান চালানোর প্রশ্নই ওঠে না। তবে? কে আছে ভেতরে?
পাগলাটে একটা দিন। দারুণ পাগলাটে একটা দিন। এ কেমন স্বপ্ন, ঘুম ভাঙার পরও যা চলতে থাকে বাস্তবের সমান্তরালে?
মোকাম আল্লাহ-খোদার নাম নিয়ে চাবি ঘুরিয়ে ঢুকে পড়ে ভেতরে। চলবে
রিপোর্টারের নাম 

























