লক্ষ্মীপুরে বিএনপির নেতা বেলাল হোসেনের বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডে দুর্বৃত্তায়ন কিংবা মবের অস্তিত্বের বিষয়ে কোনও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পায়নি পুলিশ। এ ঘটনায় রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হয়নি।
পুলিশ বলছে, নাশকতা থেকে এ ঘটনা ঘটেছে এমন বিশ্বস্ত তথ্য-প্রমাণৃ পাওয়া যায়নি। একই কথা বলছে ফায়ার সার্ভিসও। তবে বিএনপি নেতার দাবি, দরজা বাইরে থেকে তালা লাগানো লাগানো ছিল। এ কারণে তিনি দরজা দিয়ে বের হতে পারেননি। দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে কোনও দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে লাগানো হয়েছে এই আগুন। তবে দাহ্য পদার্থ ব্যবহারেরও প্রমাণ পায়নি পুলিশ।
শনিবার রাতে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমীর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আগুনের ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে বলা হয়—মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্বৃত্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনার সঙ্গে কোনও দুর্বৃত্ত কিংবা কোনও ‘মবের’ সংযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার কোনও প্রমাণ থাকলে সাংবাদিকদের পুলিশের কাছে সরবরাহ করার অনুরোধ করেছে পুলিশ।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে আগুন লাগা বা লাগানোর বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে আগুন লাগানোর তথ্য পাওয়া গেলে আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
এর আগে গত শুক্রবার গভীর রাতে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্টা এলাকায় দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে বেলালের ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে আগুনে পুড়ে মারা যায় তার সাত বছর বয়সী মেয়ে আয়েশা আক্তার। দগ্ধ হয়েছেন বেলাল হোসেন (৫০) ও তার আরও দুই মেয়ে বীথি আক্তার (১৭) এবং স্মৃতি আক্তার (১৪)। এর মধ্যে বীথি আক্তার ও স্মৃতি আক্তারকে চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। বেলালকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আগুনে বেলাল হোসেনের ঘরটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
বেলাল হোসেন ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সুতারগোপ্টা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী। ঘটনার পর বেলাল সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ঘরের দুই দরজায় তালাবদ্ধ ছিল। এ জন্য দুই মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে আমি নিজে ঘরের টিনের বেড়া ফাঁকা করে বের হয়েছি। এ সময় ছোট মেয়ে তাকে আনার জন্য চিৎকার করছিল। কিন্তু আমি আগুনের তীব্রতা আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। একপর্যায়ে আগুনের এত তীব্রতা বেড়ে গেলে ঘরে ঢুকতে পারিনি।’
তবে বেলালের এ বর্ণনার আলামত পায়নি ফায়ার সার্ভিস। লক্ষ্মীপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার রণজিৎ কুমার দাস বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত অবস্থায় এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। দরজায় তালা লাগিয়ে আগুন দেওয়ার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। ঘটনাস্থলে এমন আলামত পাইনি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার একটা মেয়ে মারা গেছে। আরেকটা মেয়ের শরীরের বেশির ভাগ পুড়ে গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে দাবি করছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাতে খতিয়ে দেখে। যদি কোনও পদার্থ ব্যবহার করা না হয়, তাহলে আমার এত বড় একটা ঘর পাঁচ মিনিটের মধ্যে কীভাবে জ্বলে যায়? দুর্বৃত্তায়ন যদি না হয় তাহলে আমার দুই দরজায় তালা মারবে কেন? দুই দরজায় তালা মারার কারণেই তো আজকে আমার এক মেয়েকে হারিয়েছি, আরেক মেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করবো, যাতে সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনে। আমি সুবিচার চাই। আমি যেহেতু বিএনপি করি, আমার প্রতিপক্ষ কেউ এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট করে কারও নাম আমি বলতে পারছি না।’
বেলালের শ্যালক শুভ জানান, বেলালের মেজো মেয়ের শরীরের ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর বড় মেয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাঁচার সম্ভাবনা কম। কারণ তার ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, ‘এখনও কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশ তদন্ত করছে। এটি রাজনৈতিক নাকি পারিবারিক কোনও বিষয় তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি পুলিশ। আমরা বেলালের পাশে রয়েছি, যাতে তিনি সুষ্ঠু বিচার পান।’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, ‘ঘটনাটির তদন্ত চলছে। এখনও মামলা হয়নি। প্রাথমিক তদন্তে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগানোর প্রমাণ মেলেনি। এটি রাজনৈতিক নাকি অন্য কোনও কারণে ঘটেছে, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে।’
রিপোর্টারের নাম 






















