ঢাকা ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচন বানচালে হাসিনা-ভারতের নীলনকশার শঙ্কা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:১২:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র-চর্চার ইতিহাসে নতুন বাঁক এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাই করছে এবং দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার উৎসব শুরু হলেও, হিন্দুত্ববাদী চাণক্যনীতির ভারত এবং মাফিয়াচক্রের নেত্রী শেখ হাসিনা ভোটের ওপর ‘হিংস্র শকুনি থাবা’ বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসিনার হুমকি-ধমকির পাশাপাশি দেশে-বিদেশে থাকা তাঁর ‘অলিগার্করা’ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

যদিও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দৌড়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে বিভেদ ও ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ চলছে, তবুও দিল্লিতে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, মাফিয়াতন্ত্রের আওয়ামী লীগ এবং তাদের রাজনৈতিক মুরুব্বি ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সবার মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় ও অটুট রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তরুণ রাজনীতিক শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার লোমহর্ষক ঘটনা জুলাই চেতনার সব শক্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে জুলাইযোদ্ধা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তির অগ্রসেনানি শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার অপরাধীকে ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ জেনেছে, হাদি হত্যাচেষ্টার প্রধান ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ছিল (ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং আদাবর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি)।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো এই ঘাতককে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও তার রাজনৈতিক পরিচয় থেকে পরিষ্কার যে হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা নির্বাচন ঠেকাতে হাসিনা ও ভারতের নীলনকশার অংশ হতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখোপাত্র হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন এবং তিনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন।

হাদি জানিয়েছেন, এর আগেও ভারতের কয়েকটি ফোন নম্বর থেকে তাঁকে হত্যার, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া এবং পরিবারের মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি-বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও নিশ্চিত করেছেন যে ভারতের ফোন নম্বর থেকেই হাদিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, হিন্দুত্ববাদী ভারত ও তাদের পোষ্য খুনি হাসিনা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যেমন সব রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, সেই ‘ইস্পাতকঠিন ঐক্য’ এখন অপরিহার্য।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর গতকাল শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ভারতের জড়িত থাকার ইঙ্গিত করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের হাসিনা নির্বাচন ঠেকানো ও হত্যাকাণ্ডের সব পরিকল্পনা করছে দিল্লিতে বসে। ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ ছাড়া আওয়ামী লীগ এ ধরনের পরিকল্পনা করতে পারে না।’ তিনি এই তৎপরতাকে ‘জঙ্গি তৎপরতা’ উল্লেখ করে ভারতীয় দূতাবাসকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ভারত সরকার একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারীকে আশ্রয় দিয়ে ইতোমধ্যে নৈতিক অপরাধ করেছে এবং এখন তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আওয়ামী লীগকে সহায়তা করছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের কাছেই নিরাপত্তা নিতে হবে এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের লোক থাকায় সরকারের প্রতি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে এবং অপরাধীকে ধরতে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘ইস্পাতকঠিন ঐক্যের’ দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এবং নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঘাতককে গ্রেপ্তার এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছে এবং হাসিনা ও ভারতের চাণক্যনীতির প্রতিবাদে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর পদক্ষেপ না দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামে বিএনপির এক সম্ভাব্য প্রার্থীকে গুলি এবং পাবনায় বিএনপির সমাবেশে গুলির ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর তদন্ত বা ফলাফল প্রকাশ নিয়ে নীরবতা চলছে। দেশের ডান-বাম-মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল, সমাজিক সংগঠন এবং সব শ্রেণিপেশার মানুষ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা আওয়ামী লীগ ও দিল্লির চাণক্যনীতির বিরুদ্ধে সজাগ এবং ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন। তিনি বলেন, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, আমরা ঐক্যের ডাক দিচ্ছি, আহ্বান জানাচ্ছি। জুলাইয়ের স্পিরিট ধারণ করা আমাদের দল-মত ভিন্ন হতে পারে—আমাদের ব্যানার ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু জুলাইয়ের প্রশ্নে, বাংলাদেশের প্রশ্নে আমরা ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচন বানচালের আওয়ামী ষড়যন্ত্র রুখতে আমরা এখন থেকেই মাঠে থাকব।’ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে গতকাল রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকের পর আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল রাজনৈতিক দলগুলোকে হাসিনা ও ভারতের চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েছে। তিনি সবাইকে দলীয় স্বার্থের বাইরে জাতীয় স্বার্থের বিষয়েও সজাগ থাকতে বলেন।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ওসমান হাদির মতো নেতার ওপর এই ‘পৈশাচিক আক্রমণের’ প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং ক্ষমতাচ্যুত শক্তি নির্বাচন বানচাল করতে চাইছে বলে সতর্ক করেন। দলগুলোর নেতারাও প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র ঠেকাতে তারা দ্বন্দ্ব ভুলে এক থাকবেন।

ওসমান হাদির ওপর হামলাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং এর পেছনে ‘বিরাট শক্তি’ কাজ করছে। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনটি না হতে দেওয়া। তিনি এই আক্রমণকে ‘খুবই সিম্বলিক’ বলে উল্লেখ করেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে এবং তারা প্রশিক্ষিত শুটার নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় এবং নির্বাচনের সব আয়োজন ভেস্তে দিতে চায়।

প্রধান উপদেষ্টা সতর্ক করেন, ‘আমরা (রাজনৈতিক দল) নিজেদের মধ্যে যেন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ি, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে; কিন্তু কাউকে শত্রু ভাবা বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে শত্রুর ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সালাহউদ্দিন, এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলগুলোর নেতারা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এটি পরিষ্কার যে, মতভেদ ও নির্বাচন ইস্যুতে যতই কাদা ছোড়াছুড়ি হোক না কেন, হাসিনার চক্রান্ত রুখতে রাজনৈতিক দলগুলো দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভারতের চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতীয় নির্বাচন কোনো অপশক্তি যাতে ঠেকাতে না পারে, সে জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

নির্বাচন বানচালে হাসিনা-ভারতের নীলনকশার শঙ্কা

আপডেট সময় : ০২:১২:১৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র-চর্চার ইতিহাসে নতুন বাঁক এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী বাছাই করছে এবং দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। সারাদেশে নির্বাচনী প্রচারণার উৎসব শুরু হলেও, হিন্দুত্ববাদী চাণক্যনীতির ভারত এবং মাফিয়াচক্রের নেত্রী শেখ হাসিনা ভোটের ওপর ‘হিংস্র শকুনি থাবা’ বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসিনার হুমকি-ধমকির পাশাপাশি দেশে-বিদেশে থাকা তাঁর ‘অলিগার্করা’ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

যদিও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার দৌড়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে বিভেদ ও ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’ চলছে, তবুও দিল্লিতে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, মাফিয়াতন্ত্রের আওয়ামী লীগ এবং তাদের রাজনৈতিক মুরুব্বি ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সবার মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় ও অটুট রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তরুণ রাজনীতিক শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার লোমহর্ষক ঘটনা জুলাই চেতনার সব শক্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে জুলাইযোদ্ধা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তির অগ্রসেনানি শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার অপরাধীকে ধরিয়ে দিলে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ জেনেছে, হাদি হত্যাচেষ্টার প্রধান ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ছিল (ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং আদাবর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি)।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো এই ঘাতককে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও তার রাজনৈতিক পরিচয় থেকে পরিষ্কার যে হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা নির্বাচন ঠেকাতে হাসিনা ও ভারতের নীলনকশার অংশ হতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখোপাত্র হাদি জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন এবং তিনি ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন।

হাদি জানিয়েছেন, এর আগেও ভারতের কয়েকটি ফোন নম্বর থেকে তাঁকে হত্যার, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া এবং পরিবারের মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি-বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও নিশ্চিত করেছেন যে ভারতের ফোন নম্বর থেকেই হাদিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে যে, হিন্দুত্ববাদী ভারত ও তাদের পোষ্য খুনি হাসিনা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যেমন সব রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, সেই ‘ইস্পাতকঠিন ঐক্য’ এখন অপরিহার্য।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর গতকাল শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ভারতের জড়িত থাকার ইঙ্গিত করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের হাসিনা নির্বাচন ঠেকানো ও হত্যাকাণ্ডের সব পরিকল্পনা করছে দিল্লিতে বসে। ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদ ছাড়া আওয়ামী লীগ এ ধরনের পরিকল্পনা করতে পারে না।’ তিনি এই তৎপরতাকে ‘জঙ্গি তৎপরতা’ উল্লেখ করে ভারতীয় দূতাবাসকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ভারত সরকার একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারীকে আশ্রয় দিয়ে ইতোমধ্যে নৈতিক অপরাধ করেছে এবং এখন তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য আওয়ামী লীগকে সহায়তা করছে। তিনি আরও বলেন, জনগণের কাছেই নিরাপত্তা নিতে হবে এবং রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের লোক থাকায় সরকারের প্রতি তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার পর সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। দেশের সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে এবং অপরাধীকে ধরতে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘ইস্পাতকঠিন ঐক্যের’ দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এবং নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঘাতককে গ্রেপ্তার এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছে এবং হাসিনা ও ভারতের চাণক্যনীতির প্রতিবাদে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর পদক্ষেপ না দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামে বিএনপির এক সম্ভাব্য প্রার্থীকে গুলি এবং পাবনায় বিএনপির সমাবেশে গুলির ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর তদন্ত বা ফলাফল প্রকাশ নিয়ে নীরবতা চলছে। দেশের ডান-বাম-মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল, সমাজিক সংগঠন এবং সব শ্রেণিপেশার মানুষ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা আওয়ামী লীগ ও দিল্লির চাণক্যনীতির বিরুদ্ধে সজাগ এবং ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন। তিনি বলেন, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন, আমরা ঐক্যের ডাক দিচ্ছি, আহ্বান জানাচ্ছি। জুলাইয়ের স্পিরিট ধারণ করা আমাদের দল-মত ভিন্ন হতে পারে—আমাদের ব্যানার ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু জুলাইয়ের প্রশ্নে, বাংলাদেশের প্রশ্নে আমরা ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচন বানচালের আওয়ামী ষড়যন্ত্র রুখতে আমরা এখন থেকেই মাঠে থাকব।’ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে গতকাল রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকের পর আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল রাজনৈতিক দলগুলোকে হাসিনা ও ভারতের চক্রান্ত সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হানাহানি শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েছে। তিনি সবাইকে দলীয় স্বার্থের বাইরে জাতীয় স্বার্থের বিষয়েও সজাগ থাকতে বলেন।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ওসমান হাদির মতো নেতার ওপর এই ‘পৈশাচিক আক্রমণের’ প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং ক্ষমতাচ্যুত শক্তি নির্বাচন বানচাল করতে চাইছে বলে সতর্ক করেন। দলগুলোর নেতারাও প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র ঠেকাতে তারা দ্বন্দ্ব ভুলে এক থাকবেন।

ওসমান হাদির ওপর হামলাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং এর পেছনে ‘বিরাট শক্তি’ কাজ করছে। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনটি না হতে দেওয়া। তিনি এই আক্রমণকে ‘খুবই সিম্বলিক’ বলে উল্লেখ করেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে এবং তারা প্রশিক্ষিত শুটার নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় এবং নির্বাচনের সব আয়োজন ভেস্তে দিতে চায়।

প্রধান উপদেষ্টা সতর্ক করেন, ‘আমরা (রাজনৈতিক দল) নিজেদের মধ্যে যেন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ি, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে; কিন্তু কাউকে শত্রু ভাবা বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে শত্রুর ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সালাহউদ্দিন, এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলগুলোর নেতারা ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ ভুলে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এটি পরিষ্কার যে, মতভেদ ও নির্বাচন ইস্যুতে যতই কাদা ছোড়াছুড়ি হোক না কেন, হাসিনার চক্রান্ত রুখতে রাজনৈতিক দলগুলো দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভারতের চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জাতীয় নির্বাচন কোনো অপশক্তি যাতে ঠেকাতে না পারে, সে জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা।