ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার লগ্নে পৌঁছে গেছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নির্বাচন কমিশন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তফসিল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)।
কিন্তু এবারের তফসিল শুধু সংসদ নির্বাচনের জন্য নয়, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে এদিন গণভোটের তফসিলও দেবেন সিইসি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে আচরণবিধি প্রতিপালনে তৎপর হবে ইসি। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে প্রচারণার সুযোগ পাবেন প্রার্থীরা।
তফসিলে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমার শেষ দিন, বাছাই, প্রত্যাহারের শেষ দিন ও ভোটের দিন থাকবে সংসদ নির্বাচনের জন্য। আর গণভোটের জন্য শুধু ভোটের দিন উল্লেখ থাকবে।
এবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোট চলবে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তফসিল ও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের ঘোষণা আগেই করেছিল ইসি। এখন সুনির্দিষ্টি দিনের অপেক্ষা। ৮ বা ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হতে পারে বলে জানান একজন নির্বাচন কমিশনার।
ভোটের পথে সরকার ও ইসি
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ অগাস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এ সরকারের বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে ২০২৫ সালের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন করার ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা।
এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের সিদ্ধান্ত হয়। ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হবে।
এ ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে গণভোটের প্রস্তুতিও শেষ করে। ২৯ নভেম্বর ‘মক ভোটিং’ করে অভিজ্ঞতা নিয়ে ভোটগ্রহণের সময় ও বুথের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের যাত্রা শুরু ২০২৪ সালের নভেম্বরে।
কমিশনের বাকি চার সদস্য হচ্ছেন, নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। আর নির্বাচন কমিশন সচিব হিসেবে রয়েছেন আখতার আহমেদ।
এবার নির্বাচনে পৌনে ১৩ কোটি ভোটার রয়েছে। পোস্টাল ভোটিংয়ে নিবন্ধিত প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি ও নিজ ভোটার এলাকার বাইরে থাকা সরকারি কর্মকর্তারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন।
শেষ মুহূর্তে সীমানা নিয়ে জটিলতা
তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতির মধ্যে বাগেরহাটের সংসদীয় আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটি করে নির্বাচন কমিশন যে গেজেট জারি করেছে, তা ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
তবে আদালতের ওই রায় তফসিলে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “প্রভাব ফেলার তো কথা না। আমাদের মত আমরা (তফসিল) ঘোষণা দেব। যদি ওইটা (বাগেরহাটের আসন) না দিতে হয়, না দেব, অসুবিধা নেই। আমরা বসব অর্ডার নিয়ে; দেখি কী হয়। আমাদের মতো আমরা ঘোষণা দেব।”
বাগেরহাটের সংসদীয় আসন চারটি ও গাজীপুর পাঁচটি আসন থাকবে বলে রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ।
বাগেরহাটে সংসদীয় আসন চারটি থেকে কমিয়ে তিনটি করাসংক্রান্ত ইসির গেজেটের বৈধতা নিয়ে করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গেল ১০ নভেম্বর হাই কোর্ট রায় দেয়।
রায়ে বাগেরহাটে চারটি সংসদীয় আসন এবং গাজীপুরের পাঁচটি আসন পুনর্বহাল করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গেজেট প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বঙ্গভবন থেকে ফিরে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনাররা নিজেরা বৈঠকে বসেন। এরপর সিইসির ভাষণও রেকর্ড করা হয়।
বাগেরহাট ও গাজীপুরের সংসদীয় আসন নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ের পর কোনো জটিলতা হবে কিনা, এমন প্রশ্নে নির্বাচন ভবনে ফিরে কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে ৩০০ আসনের তফসিল হবে। রায় পাওয়ার পরে যদি কোনো কারণবশত সংশোধনের প্রয়োজন হয়, সেটাও নিয়ম অনুযায়ী করা যাবে। কোর্টের অর্ডার এখনও আমরা হাতে পাইনি।”
তফসিলের আগে দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ
উপদেষ্টারা পদে থেকে ভোট করতে পারবেন না, নির্বাচন কমিশন থেকে এমন ঘোষণার পরই অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা সড়ে দাঁড়িয়েছেন।
তারা হলেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম।
বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় যমুনায় সংবাদ সম্মেলন করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “বিকাল ৫টায় যমুনায় পদত্যাগপত্র জমা দেন দুই উপদেষ্টা। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পদত্যাগ কার্যকর হবে।”
চ্যালেঞ্জ ভোট গণণায়
ভোট সামনে রেখে দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন গুছিয়ে এনেছে। ইতোমধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল তাদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে।
সব কিছু মিলিয়ে ভোটের আবহ তৈরি হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম।
তিনি বলেন, “আগের চারটি কেয়ারটেকার সরকারের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এখনও ওই অবস্থায় পৌঁছাতে পারিনি আমরা। তফসিল ঘোষণার সময় আগেরগুলো যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থায় যেতে পারিনি। আশা করি, তফসিল ঘোষণার পরে দলগুলোর পাশাপাশি অংশীজনদের সবাই পুরোপুরি নির্বাচনমুখী হয়ে যাবে।
“তফসিল ঘোষণা করলে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী দায়-দায়িত্ব আরও সতর্কতার সঙ্গে, গুরুত্বের সঙ্গে পালন করলে পরিস্থিতিটা ভালো হতে পারে।”
এবার সংসদ ও গণভোট- দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়ায় সময় ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি গণণার বিষয়েও চ্যালেঞ্জ থাকার কথা তুলে ধরেন এ বিশ্লেষক।
২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ৮৭% ভোট পড়ার প্রসঙ্গ টেনে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “সবচেয়ে বড় দুটো বিষয় হচ্ছে- একজন ব্যক্তির দুটো ভোট দিতে কত সময় লাগবে? যেভাবে ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপন করা হচ্ছে, ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে পারবেন কিনা। ৮০ শতাংশ বিবেচনায় ১০ কোটি ভোট পড়লে ব্যালট গুণতে হবে ২০ কোটি।”
ভোট গণনার সময় যেন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি না হয়, সে বিষয়ে প্রস্তুতির কথা তুলে ধরেন তিনি।
“ভোট গণনার সেই প্রস্তুতি যেমন রাখতে হবে, বিশেষ করে বাংলাদেশে কাউন্টিং দেরি হলে দলীয় প্রার্থীরা অস্থির হয়ে যান, সেখান থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, এটা মাথায় রাখতে হবে, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।”
এখন পর্যন্ত অবশ্য ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশনা।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে জাতি এগিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবার মধ্যে উৎসাহ ও উৎসবের ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেদিক থেকে আমরা সার্বিক বিবেচনায় সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
সবচেয়ে বেশি ভোটার ঢাকায়
এবার ১২ কোটি ৭৭ লাখের মতো ভোটার রয়েছে। ভোটকেন্দ্র থাকছে ৪৩ হাজারের বেশি; আর ভোটকক্ষের সংখ্যা আড়াই লাখের মতো।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ছাড়াও নির্বাহী হাকিম, বিচারিক হাকিমসহ ভোটের দায়িত্বে থাকবে অনেক লোকবল।
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা থাকবে ৯ থেকে ১০ লাখ। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য থাকবে ৭ থেকে ৮ লাখ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে এবারও ঝালকাঠি-১ আসনে সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছে; ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে ঢাকা-১৯ আসনে; ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন।
সেক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভোটারের আসনের প্রার্থীরা ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন; তবে ঢাকা-১৯ আসনের প্রার্থীরা প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করার (ভোটার প্রতি ১০) করার সুযোগ পাচ্ছে।
বাগেরহাট ও গাজীপুরের আসন পুনর্বহাল হলে আসনভিত্তিক ভোটার সংখ্যার তারতম্য হতে পারে এসব জেলায়।
রিপোর্টারের নাম 



















