মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৮:২৯ অপরাহ্ন | ৫ই নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ২০শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

৯ মাস পর ফিরল স্বস্তি, কিন্তু পর্যটনে ফের সেন্ট মার্টিনে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

  • হালনাগাদ সময় : ০৪:১০:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

টানা দীর্ঘ ৯ মাস পর্যটকশূন্য থাকার পর দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন তার হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক রূপ ও সতেজতা ফিরে পেয়েছিল। তবে সেই স্বস্তির মাঝে নতুন করে দ্বীপটির আকাশজুড়ে ঘনীভূত হচ্ছে গভীর দুশ্চিন্তা ও চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের কালো মেঘ। বর্তমান সরকার চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং দৈনিক সাড়ে তিন হাজার দর্শনার্থীকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। যদিও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও নাফ নদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে টেকনাফ থেকে এখনও নিয়মিত পর্যটক পরিবহনের অনুমতি পায়নি জাহাজগুলো।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, দ্বীপটি বর্তমানে এমনিতেই নিজস্ব ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী বাসিন্দার বোঝা নিয়ে ধুঁকছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে ফের পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হলে মানুষের অতিরিক্ত চাপে ভঙ্গুর দ্বীপটিতে নতুন করে অপূরণীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক দশক আগের গবেষণার বিশদ তথ্য অনুযায়ী, আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনের মধ্যে মানুষের বসবাসের উপযোগী এলাকা মাত্র চার বর্গকিলোমিটার। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, দ্বীপটির সর্বোচ্চ স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ। অথচ বর্তমানে কেবল স্থায়ী বাসিন্দা ও কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়েই সেখানে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। এর সঙ্গে সরকার অনুমোদিত প্রতিদিনের সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যুক্ত হলে দ্বীপটিতে অবস্থানকারী মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজারে, যা সামগ্রিক প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতার তিন গুণেরও বেশি।

সেন্ট মার্টিনের ভূ-প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দ্বীপটির ভূখণ্ড প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত নরম, ভঙ্গুর ও দুর্বল। এটি কোনোভাবেই ভারী বহুতল অবকাঠামো কিংবা অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভার সহ্য করার উপযোগী নয়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া সুস্পষ্টভাবে জানান, সেন্ট মার্টিনে আদতে কোনো সুদৃঢ় মাটি নেই; ওখানকার পুরো ভূখণ্ড মূলত বালু, চুনাপাথর এবং মৃত প্রবালের সংমিশ্রণে গঠিত।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর ও টেকনাফ উপজেলা পরিষদের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, বিগত ২০১৫ সালে সেন্ট মার্টিনে জনসংখ্যা ছিল প্রায় আট হাজার এবং হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ থেকে ৫০টি। কিন্তু বর্তমানে লাগামহীনভাবে গড়ে উঠে সেই বাণিজ্যিক রিসোর্টের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে গেছে। নির্বিচারে ঘরবাড়ি, হোটেল ও মোটেল নির্মাণের আগ্রাসনে ২০১৫ সালের ৯৭ হেক্টর কৃষিজমি বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে কমে নেমে এসেছে মাত্র ৫৫ দশমিক ৬ হেক্টরে। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার লোক বাস করেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পরিবেশের কথা চিন্তা করে বছরে কেবল দুই মাস দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের ভ্রমণের অনুমতি নির্ধারণ করেছিল। তবে ব্যাপক জনপ্রত্যাশা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবির মুখে বর্তমান নির্বাচিত সরকার প্রায় সাড়ে চার মাসের জন্য দ্বীপটিকে উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অথচ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। চলতি বছর সেন্ট মার্টিনে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ রাখার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে কাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশেনোগ্রাফি বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষকদল। তাদের বিস্তারিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, টানা ৯ মাস সেখানে সব ধরনের পর্যটক আগমন ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ থাকায় বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রজলের গুণগত মানে অভাবনীয় উন্নতি ও বিশুদ্ধতা ফিরে এসেছে। গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক জোবায়ের আলম জানান, মানুষের ভিড় ও ভারী জাহাজের অবিরাম যাতায়াত বন্ধ থাকায় সাগরের পানিতে প্রাকৃতিক দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটনের বর্জ্য ও ক্ষতিকর দূষণ না থাকায় সামগ্রিক সামুদ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা তার প্রাকৃতিক ভারসাম্যে ফিরে আসার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে; অর্থাৎ প্রকৃতিকে সামান্য নির্ভার সময় দিলে সে নিজেই নিজেকে নিরাময় করতে সক্ষম।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের এমন ইতিবাচক গবেষণালব্ধ ফলাফলকে কোনো তোয়াক্কা না করে সরকার দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগসহ প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার মানুষকে যাওয়ার নীতিগত অনুমতি দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপটির অস্তিত্ব চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে মত প্রকাশ করছেন পরিবেশবিদরা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, মন্ত্রণালয়ের জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই পর্যটকদের ভ্রমণের এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও পরবর্তীতে তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে কোনো নতুন বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে কি না তা তাঁর জানা নেই; মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের মাধ্যমেই পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সীমান্তবর্তী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নাফ নদে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথ হিসেবে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদী কিংবা ইনানী নৌবাহিনীর জেটি থেকে সাগরে জাহাজ পরিচালনার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। আগের বছরের নিয়ম বহাল রেখে এবারও দ্বীপে যেতে হলে পর্যটকদের সরকারি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পূর্বনিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা নিয়ে এক যুগ আগে পথিকৃৎ গবেষণা সম্পন্ন করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সেন্ট মার্টিনকে দেশের আর দশটা সাধারণ পর্যটন স্পট হিসেবে বিবেচনা করা চরম মূর্খতা ও বড় ভুল। দ্বীপটির প্রাকৃতিক অস্তিত্ব রক্ষায় একে অবিলম্বে সংরক্ষিত বিশেষ পর্যটন জোন হিসেবে রূপান্তর করা আবশ্যক। বিশ্বজুড়ে যেখানে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ইকোট্যাক্স বা ফি বাধ্যতামূলক, সেখানে বাংলাদেশে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভে নামমাত্র পরিবেশ ফি-ও বাতিল করে দেওয়ার কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

সরেজমিনে দ্বীপে গিয়ে দেখা যায়, সেন্ট মার্টিনকে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দেওয়াল কেয়াবন বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন। দ্বীপের পশ্চিম তীর ঘেঁষে দক্ষিণাংশ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ কেয়াবন নির্মমভাবে কেটে রাতারাতি তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য বাণিজ্যিক রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন দোকানপাট। প্রাকৃতিক বৃক্ষহীন হয়ে পড়ায় সাগরের জোয়ারের পানির সরাসরি আঘাতে চারপাশের সৈকতের বালিয়াড়ি হুড়মুড় করে ভেঙে ধসে পড়ছে।

প্রশাসনের নমনীয় মনোভাব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এবং বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, বিগত সরকারগুলোর বিভিন্ন পরিবেশগত নথির ওপর ভিত্তি করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের মতামত নিয়ে সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি সার্বিক পরিবেশবান্ধব মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। বর্তমান সরকার আগের সেই কাঠামোকে পুরোপুরি বাতিল না করলেও পর্যটন ব্যবসায়ী, জাহাজমালিক ও রিসোর্ট সিন্ডিকেটের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে পর্যটকের সংখ্যা এবং ভ্রমণের সময়সীমা উভয়ই বাড়িয়ে অত্যন্ত নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। সঠিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করলে কোনোভাবেই নিয়ম শিথিল করার সুযোগ ছিল না, বরং তা আরও অনেক বেশি কঠোর হওয়া দরকার ছিল।

রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে দাবি করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও উল্লেখ করেন, কেবল পর্যটকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া শুধু ওয়েবসাইট খুলে টিকিট কাটার নিয়ম বেঁধে দিলেই মাঠের অনিয়ম ও দূষণ বন্ধ হবে না। মালিকদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তির মদত থাকলে প্রশাসনের দুর্বল কর্মকর্তাদের পক্ষে সেখানে নিরপেক্ষ তদারকি চালানো অসম্ভব। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, সেন্ট মার্টিনে গড়ে ওঠা প্রায় সব রিসোর্টই সম্পূর্ণ অবৈধ। সেখানে পর্যটক সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ হলো এসব দখলদার ও অবৈধ রিসোর্টগুলোকে এক ধরনের পরোক্ষ প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া; সরকার আসলে কী চাইছে তা গভীরভাবে ভাবা উচিত। দ্বীপটি যদি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সরকারের তথাকথিত ‘টেকসই উন্নয়ন’ এক তিক্ত প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত হবে। তাই সাময়িকভাবে জবাবদিহির পরিধি সংকুচিত মনে হলেও প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য পরবর্তীতে সব সরকারকেই ইতিহাসের কাছে কঠোর দায় নিতে হবে।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

আকাশছোঁয়া খরচ ও চড়া ট্যাক্সের জাঁতাকল: জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা

05 November 2026

প্রথমবারের মতো কুবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় স্নাতক গণিত অলিম্পিয়াড

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

৯ মাস পর ফিরল স্বস্তি, কিন্তু পর্যটনে ফের সেন্ট মার্টিনে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

হালনাগাদ সময় : ০৪:১০:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

টানা দীর্ঘ ৯ মাস পর্যটকশূন্য থাকার পর দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন তার হারিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক রূপ ও সতেজতা ফিরে পেয়েছিল। তবে সেই স্বস্তির মাঝে নতুন করে দ্বীপটির আকাশজুড়ে ঘনীভূত হচ্ছে গভীর দুশ্চিন্তা ও চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের কালো মেঘ। বর্তমান সরকার চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে এবং দৈনিক সাড়ে তিন হাজার দর্শনার্থীকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। যদিও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও নাফ নদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে টেকনাফ থেকে এখনও নিয়মিত পর্যটক পরিবহনের অনুমতি পায়নি জাহাজগুলো।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, দ্বীপটি বর্তমানে এমনিতেই নিজস্ব ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী বাসিন্দার বোঝা নিয়ে ধুঁকছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে ফের পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হলে মানুষের অতিরিক্ত চাপে ভঙ্গুর দ্বীপটিতে নতুন করে অপূরণীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক দশক আগের গবেষণার বিশদ তথ্য অনুযায়ী, আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনের মধ্যে মানুষের বসবাসের উপযোগী এলাকা মাত্র চার বর্গকিলোমিটার। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, দ্বীপটির সর্বোচ্চ স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ। অথচ বর্তমানে কেবল স্থায়ী বাসিন্দা ও কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়েই সেখানে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। এর সঙ্গে সরকার অনুমোদিত প্রতিদিনের সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যুক্ত হলে দ্বীপটিতে অবস্থানকারী মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজারে, যা সামগ্রিক প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতার তিন গুণেরও বেশি।

সেন্ট মার্টিনের ভূ-প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান চালানো বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দ্বীপটির ভূখণ্ড প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত নরম, ভঙ্গুর ও দুর্বল। এটি কোনোভাবেই ভারী বহুতল অবকাঠামো কিংবা অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভার সহ্য করার উপযোগী নয়। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোলাম কিবরিয়া সুস্পষ্টভাবে জানান, সেন্ট মার্টিনে আদতে কোনো সুদৃঢ় মাটি নেই; ওখানকার পুরো ভূখণ্ড মূলত বালু, চুনাপাথর এবং মৃত প্রবালের সংমিশ্রণে গঠিত।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর ও টেকনাফ উপজেলা পরিষদের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, বিগত ২০১৫ সালে সেন্ট মার্টিনে জনসংখ্যা ছিল প্রায় আট হাজার এবং হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫ থেকে ৫০টি। কিন্তু বর্তমানে লাগামহীনভাবে গড়ে উঠে সেই বাণিজ্যিক রিসোর্টের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে গেছে। নির্বিচারে ঘরবাড়ি, হোটেল ও মোটেল নির্মাণের আগ্রাসনে ২০১৫ সালের ৯৭ হেক্টর কৃষিজমি বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে কমে নেমে এসেছে মাত্র ৫৫ দশমিক ৬ হেক্টরে। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার লোক বাস করেন। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার পরিবেশের কথা চিন্তা করে বছরে কেবল দুই মাস দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের ভ্রমণের অনুমতি নির্ধারণ করেছিল। তবে ব্যাপক জনপ্রত্যাশা ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দাবির মুখে বর্তমান নির্বাচিত সরকার প্রায় সাড়ে চার মাসের জন্য দ্বীপটিকে উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অথচ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। চলতি বছর সেন্ট মার্টিনে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ রাখার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতে কাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশেনোগ্রাফি বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের গবেষকদল। তাদের বিস্তারিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, টানা ৯ মাস সেখানে সব ধরনের পর্যটক আগমন ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ থাকায় বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রজলের গুণগত মানে অভাবনীয় উন্নতি ও বিশুদ্ধতা ফিরে এসেছে। গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক জোবায়ের আলম জানান, মানুষের ভিড় ও ভারী জাহাজের অবিরাম যাতায়াত বন্ধ থাকায় সাগরের পানিতে প্রাকৃতিক দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পর্যটনের বর্জ্য ও ক্ষতিকর দূষণ না থাকায় সামগ্রিক সামুদ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা তার প্রাকৃতিক ভারসাম্যে ফিরে আসার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে; অর্থাৎ প্রকৃতিকে সামান্য নির্ভার সময় দিলে সে নিজেই নিজেকে নিরাময় করতে সক্ষম।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের এমন ইতিবাচক গবেষণালব্ধ ফলাফলকে কোনো তোয়াক্কা না করে সরকার দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগসহ প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার মানুষকে যাওয়ার নীতিগত অনুমতি দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপটির অস্তিত্ব চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে মত প্রকাশ করছেন পরিবেশবিদরা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, মন্ত্রণালয়ের জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই পর্যটকদের ভ্রমণের এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যটকদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও পরবর্তীতে তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে কোনো নতুন বিজ্ঞানভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে কি না তা তাঁর জানা নেই; মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী বৈঠকের মাধ্যমেই পুরো বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সীমান্তবর্তী উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নাফ নদে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথ হিসেবে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদী কিংবা ইনানী নৌবাহিনীর জেটি থেকে সাগরে জাহাজ পরিচালনার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। আগের বছরের নিয়ম বহাল রেখে এবারও দ্বীপে যেতে হলে পর্যটকদের সরকারি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পূর্বনিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা নিয়ে এক যুগ আগে পথিকৃৎ গবেষণা সম্পন্ন করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সেন্ট মার্টিনকে দেশের আর দশটা সাধারণ পর্যটন স্পট হিসেবে বিবেচনা করা চরম মূর্খতা ও বড় ভুল। দ্বীপটির প্রাকৃতিক অস্তিত্ব রক্ষায় একে অবিলম্বে সংরক্ষিত বিশেষ পর্যটন জোন হিসেবে রূপান্তর করা আবশ্যক। বিশ্বজুড়ে যেখানে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ইকোট্যাক্স বা ফি বাধ্যতামূলক, সেখানে বাংলাদেশে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের লোভে নামমাত্র পরিবেশ ফি-ও বাতিল করে দেওয়ার কড়া সমালোচনা করেন তিনি।

সরেজমিনে দ্বীপে গিয়ে দেখা যায়, সেন্ট মার্টিনকে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দেওয়াল কেয়াবন বর্তমানে প্রায় নিশ্চিহ্ন। দ্বীপের পশ্চিম তীর ঘেঁষে দক্ষিণাংশ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ কেয়াবন নির্মমভাবে কেটে রাতারাতি তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য বাণিজ্যিক রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন দোকানপাট। প্রাকৃতিক বৃক্ষহীন হয়ে পড়ায় সাগরের জোয়ারের পানির সরাসরি আঘাতে চারপাশের সৈকতের বালিয়াড়ি হুড়মুড় করে ভেঙে ধসে পড়ছে।

প্রশাসনের নমনীয় মনোভাব নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা এবং বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, বিগত সরকারগুলোর বিভিন্ন পরিবেশগত নথির ওপর ভিত্তি করেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় প্রান্তিক মানুষের মতামত নিয়ে সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি সার্বিক পরিবেশবান্ধব মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। বর্তমান সরকার আগের সেই কাঠামোকে পুরোপুরি বাতিল না করলেও পর্যটন ব্যবসায়ী, জাহাজমালিক ও রিসোর্ট সিন্ডিকেটের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে পর্যটকের সংখ্যা এবং ভ্রমণের সময়সীমা উভয়ই বাড়িয়ে অত্যন্ত নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। সঠিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করলে কোনোভাবেই নিয়ম শিথিল করার সুযোগ ছিল না, বরং তা আরও অনেক বেশি কঠোর হওয়া দরকার ছিল।

রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে দাবি করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরও উল্লেখ করেন, কেবল পর্যটকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। তাছাড়া শুধু ওয়েবসাইট খুলে টিকিট কাটার নিয়ম বেঁধে দিলেই মাঠের অনিয়ম ও দূষণ বন্ধ হবে না। মালিকদের পেছনে রাজনৈতিক শক্তির মদত থাকলে প্রশাসনের দুর্বল কর্মকর্তাদের পক্ষে সেখানে নিরপেক্ষ তদারকি চালানো অসম্ভব। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, সেন্ট মার্টিনে গড়ে ওঠা প্রায় সব রিসোর্টই সম্পূর্ণ অবৈধ। সেখানে পর্যটক সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ হলো এসব দখলদার ও অবৈধ রিসোর্টগুলোকে এক ধরনের পরোক্ষ প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া; সরকার আসলে কী চাইছে তা গভীরভাবে ভাবা উচিত। দ্বীপটি যদি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সরকারের তথাকথিত ‘টেকসই উন্নয়ন’ এক তিক্ত প্রহসন হিসেবে চিহ্নিত হবে। তাই সাময়িকভাবে জবাবদিহির পরিধি সংকুচিত মনে হলেও প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য পরবর্তীতে সব সরকারকেই ইতিহাসের কাছে কঠোর দায় নিতে হবে।

Share this news as a Photo Card