ঢাকা ১২:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

ডিগ্রিধারী নয়, দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির কারখানাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে বের হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান মিলছে না অনেকেরই। একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পখাত দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলছে। এই সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা।

উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট: একটি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো প্রথাগত পরীক্ষা-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বৃত্তে আটকে আছে। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে শুধু জিপিএ বা কাগজের ডিগ্রির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (Problem-solving), দলগত কাজ (Teamwork), প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও যোগাযোগ দক্ষতা।

কর্মবাজারে দক্ষতার চাহিদা (ভবিষ্যৎ বাস্তবতা ২০৩০): বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির বিবর্তনে অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হতে চলেছে। আগামী দিনে যেসব দক্ষতার চাহিদা বাড়বে:

  • বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের সক্ষমতা
  • নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা
  • আজীবন শেখার মানসিকতা (Lifelong Learning)

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিল্পখাতের দূরত্ব

বাংলাদেশে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছে না এবং নতুন কর্মীদের নিয়োগের পর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ভার বহন করতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে করণীয়সমূহ: ১. বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ: পাঠ্যক্রমের সাথে শিল্পকারখানায় বাস্তব প্রশিক্ষণের সমন্বয়। ২. পাঠ্যক্রম হালনাগাদ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল সাক্ষরতার মতো আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। ৩. ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার: প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার সচেতন ও দক্ষ করে গড়ে তোলা। ৪. গবেষণায় বিনিয়োগ: জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা।

সফল মডেল থেকে শিক্ষা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো উচ্চশিক্ষাকে সরাসরি অর্থনীতির সাথে যুক্ত করেছে। যেমন, জার্মানির ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে নিয়মিত শিল্পখাতের পরামর্শে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা হয়। বাংলাদেশেরও এখন সময় এসেছে প্রথাগত সনদ বিতরণের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে নজর দেওয়ার।

পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য সমাবর্তনের মঞ্চে নয়, বরং স্নাতকদের কর্মজীবনের সফলতায় নিহিত। ডিগ্রি কেবল কাগজের সনদ না হয়ে যেন হয় জাতীয় উন্নয়নের শক্তিশালী পাসপোর্ট, সেটিই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

চিরবিদায় নিলেন ‘জুরাসিক পার্ক’ খ্যাত অভিনেতা স্যাম নিল

ডিগ্রিধারী নয়, দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির কারখানাই হোক বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট সময় : ১১:৪৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে বের হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান মিলছে না অনেকেরই। একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন শিল্পখাত দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলছে। এই সংকট নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা।

উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট: একটি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো প্রথাগত পরীক্ষা-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বৃত্তে আটকে আছে। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে শুধু জিপিএ বা কাগজের ডিগ্রির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (Problem-solving), দলগত কাজ (Teamwork), প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও যোগাযোগ দক্ষতা।

কর্মবাজারে দক্ষতার চাহিদা (ভবিষ্যৎ বাস্তবতা ২০৩০): বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির বিবর্তনে অনেক পুরোনো পেশা বিলুপ্ত হতে চলেছে। আগামী দিনে যেসব দক্ষতার চাহিদা বাড়বে:

  • বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের সক্ষমতা
  • নেতৃত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা
  • আজীবন শেখার মানসিকতা (Lifelong Learning)

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিল্পখাতের দূরত্ব

বাংলাদেশে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছে না এবং নতুন কর্মীদের নিয়োগের পর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ভার বহন করতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে করণীয়সমূহ: ১. বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ: পাঠ্যক্রমের সাথে শিল্পকারখানায় বাস্তব প্রশিক্ষণের সমন্বয়। ২. পাঠ্যক্রম হালনাগাদ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল সাক্ষরতার মতো আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। ৩. ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার: প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার সচেতন ও দক্ষ করে গড়ে তোলা। ৪. গবেষণায় বিনিয়োগ: জ্ঞান উৎপাদন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা।

সফল মডেল থেকে শিক্ষা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো উচ্চশিক্ষাকে সরাসরি অর্থনীতির সাথে যুক্ত করেছে। যেমন, জার্মানির ‘ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম’ যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে নিয়মিত শিল্পখাতের পরামর্শে পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা হয়। বাংলাদেশেরও এখন সময় এসেছে প্রথাগত সনদ বিতরণের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে নজর দেওয়ার।

পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য সমাবর্তনের মঞ্চে নয়, বরং স্নাতকদের কর্মজীবনের সফলতায় নিহিত। ডিগ্রি কেবল কাগজের সনদ না হয়ে যেন হয় জাতীয় উন্নয়নের শক্তিশালী পাসপোর্ট, সেটিই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।