ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মালিতে মাটির তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

আফ্রিকার প্রাচীন দেশ মালি। তার মধ্যাঞ্চলের মোপতি এলাকায় বানি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন “জেনে জামে মসজিদ”। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; বরং জেনে শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ সাল থেকেই এখানে মানুষের বসতি ছিল, আর ১৬শ শতকে শহরটি পরিণত হয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে।

নির্মাণ ইতিহাস

মসজিদটির প্রথম নির্মাণ হয় ১৩শ শতকে, মালি সাম্রাজ্যের উত্থানকালে। ধারণা করা হয়, রাজা কোই কোনবোরো তার প্রাসাদের স্থানে এটি নির্মাণ করেছিলেন। পরে ১৮৩৪ সালে শাসক আমাদু লোবো মসজিদটি ভেঙে ফেলেন, কারণ তার মতে, এটি অত্যধিক রাজকীয়। ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় কারিগর ইসমাইল ত্রাওরে পুরনো নকশা অনুসরণ করে ১৯০৬ সালে পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। ১৯০৯ সালে এটি আজকের রূপে সম্পন্ন হয়। তবে এর কবরস্থান অংশে এখনো ১৩শ শতকের কিছু অংশ অক্ষত রয়েছে।

গঠন ও আয়তন

মসজিদটি তৈরি হয়েছে বন্যা থেকে রক্ষার জন্য উঁচু মাটির প্ল্যাটফর্মের ওপর, যার আয়তন প্রায় ৭৫ মিটার × ৭৫ মিটার। নামাজঘরটি পূর্বদিকে, আয়তন প্রায় ২৬ মিটার × ৫০ মিটার, আর পশ্চিমদিকে রয়েছে প্রশস্ত খোলা আঙিনা। ভেতরে রয়েছে ৯০টি বিশাল স্তম্ভ, যা ছাদের ভার বহন করে, ভেতরটা যেন এক ছায়াময় স্থিত মাটির বন।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

জেনে জামে মসজিদকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাঁচামাটির নির্মাণ স্থাপনা বলা হয়। এখানে ব্যবহৃত ইট তৈরি হয় স্থানীয়ভাবে পাওয়া ‘ফেরি’ মাটি, খড়, পানি ও নদীর পলি মিশিয়ে সূর্যের তাপে শুকিয়ে। দেয়ালের বাইরের কাঠের দণ্ডগুলো শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়, সংস্কারের সময় এগুলোই হয় মাচা। সৌন্দর্য ও ব্যবহারিকতা দুটিই এই স্থাপত্যে একাকার। মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি মিনার, যার মাঝেরটি প্রায় ১৬ মিটার উঁচু।

শৈল্পিক সৌন্দর্য

জেনে মসজিদের রূপ দিনে দিনে আলো ও ছায়ার সঙ্গে বদলে যায়। সকালে এটি মাটির মতো মলিন, দুপুরে সোনালি, সন্ধ্যায় ধূসর। আলো–আঁধারির এই খেলা স্থাপনাটিকে জীবন্ত করে তোলে। ভেতরের শান্ত অন্ধকার যেন ধ্যানের আবহ তৈরি করে। স্তম্ভগুলোর পরপর বিন্যাস মনকে স্থির করে দেয়। মিনারের মাথায় থাকা উটপাখির ডিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে জীবন, পুনর্জন্ম ও সুরক্ষার প্রতীক, যা মসজিদের শিল্পভাবনাকে গভীর করে।

সামাজিক ভূমিকা

জেনে মসজিদ শহরের সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্র। প্রতি বছর স্থানীয়রা ‘ফেতে দ্য লা ক্রেপিসাজ’ উৎসবে একসাথে দেয়াল সংস্কার করে—বৃদ্ধ, যুবক, নারী, শিশু সবাই অংশ নেয়। এই ঐক্যবদ্ধ শ্রম মসজিদকে শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং সম্পর্ক, ঐক্য ও বিশ্বাসের জীবন্ত প্রতীকে পরিণত করেছে।

এই অনন্য ঐতিহাসিক, স্থাপত্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণেই ইউনেস্কো জেনে জামে মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আজ

মালিতে মাটির তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদ

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫

আফ্রিকার প্রাচীন দেশ মালি। তার মধ্যাঞ্চলের মোপতি এলাকায় বানি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন “জেনে জামে মসজিদ”। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; বরং জেনে শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ সাল থেকেই এখানে মানুষের বসতি ছিল, আর ১৬শ শতকে শহরটি পরিণত হয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে।

নির্মাণ ইতিহাস

মসজিদটির প্রথম নির্মাণ হয় ১৩শ শতকে, মালি সাম্রাজ্যের উত্থানকালে। ধারণা করা হয়, রাজা কোই কোনবোরো তার প্রাসাদের স্থানে এটি নির্মাণ করেছিলেন। পরে ১৮৩৪ সালে শাসক আমাদু লোবো মসজিদটি ভেঙে ফেলেন, কারণ তার মতে, এটি অত্যধিক রাজকীয়। ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে স্থানীয় কারিগর ইসমাইল ত্রাওরে পুরনো নকশা অনুসরণ করে ১৯০৬ সালে পুনর্নির্মাণ শুরু করেন। ১৯০৯ সালে এটি আজকের রূপে সম্পন্ন হয়। তবে এর কবরস্থান অংশে এখনো ১৩শ শতকের কিছু অংশ অক্ষত রয়েছে।

গঠন ও আয়তন

মসজিদটি তৈরি হয়েছে বন্যা থেকে রক্ষার জন্য উঁচু মাটির প্ল্যাটফর্মের ওপর, যার আয়তন প্রায় ৭৫ মিটার × ৭৫ মিটার। নামাজঘরটি পূর্বদিকে, আয়তন প্রায় ২৬ মিটার × ৫০ মিটার, আর পশ্চিমদিকে রয়েছে প্রশস্ত খোলা আঙিনা। ভেতরে রয়েছে ৯০টি বিশাল স্তম্ভ, যা ছাদের ভার বহন করে, ভেতরটা যেন এক ছায়াময় স্থিত মাটির বন।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

জেনে জামে মসজিদকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাঁচামাটির নির্মাণ স্থাপনা বলা হয়। এখানে ব্যবহৃত ইট তৈরি হয় স্থানীয়ভাবে পাওয়া ‘ফেরি’ মাটি, খড়, পানি ও নদীর পলি মিশিয়ে সূর্যের তাপে শুকিয়ে। দেয়ালের বাইরের কাঠের দণ্ডগুলো শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়, সংস্কারের সময় এগুলোই হয় মাচা। সৌন্দর্য ও ব্যবহারিকতা দুটিই এই স্থাপত্যে একাকার। মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি মিনার, যার মাঝেরটি প্রায় ১৬ মিটার উঁচু।

শৈল্পিক সৌন্দর্য

জেনে মসজিদের রূপ দিনে দিনে আলো ও ছায়ার সঙ্গে বদলে যায়। সকালে এটি মাটির মতো মলিন, দুপুরে সোনালি, সন্ধ্যায় ধূসর। আলো–আঁধারির এই খেলা স্থাপনাটিকে জীবন্ত করে তোলে। ভেতরের শান্ত অন্ধকার যেন ধ্যানের আবহ তৈরি করে। স্তম্ভগুলোর পরপর বিন্যাস মনকে স্থির করে দেয়। মিনারের মাথায় থাকা উটপাখির ডিম আফ্রিকার সংস্কৃতিতে জীবন, পুনর্জন্ম ও সুরক্ষার প্রতীক, যা মসজিদের শিল্পভাবনাকে গভীর করে।

সামাজিক ভূমিকা

জেনে মসজিদ শহরের সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্র। প্রতি বছর স্থানীয়রা ‘ফেতে দ্য লা ক্রেপিসাজ’ উৎসবে একসাথে দেয়াল সংস্কার করে—বৃদ্ধ, যুবক, নারী, শিশু সবাই অংশ নেয়। এই ঐক্যবদ্ধ শ্রম মসজিদকে শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং সম্পর্ক, ঐক্য ও বিশ্বাসের জীবন্ত প্রতীকে পরিণত করেছে।

এই অনন্য ঐতিহাসিক, স্থাপত্যিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণেই ইউনেস্কো জেনে জামে মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।