রাজবাড়ী জেলার চাষিরা এখন ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ লাগানো আর সেগুলোর যত্ন নেওয়া নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই পেঁয়াজটা বাজারে আসতে অবশ্য প্রায় ২ থেকে ৩ মাস লেগে যাবে। এ বছর এই পেঁয়াজ চাষ করতে গিয়ে কৃষকদের বিঘা প্রতি খরচও হচ্ছে অনেক—প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে আছে জমি তৈরি, পেঁয়াজের গুটি (বীজ) কেনা, সার-ওষুধ আর শ্রমিকের খরচ। অবশ্য, জমি যদি নিজের হয়, তাহলে খরচটা প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা কমে যায়। কারণ, এক বিঘা জমি লিজ নিতেই কৃষকদের ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা আলাদা করে গুনতে হচ্ছে।
চাষিরা বলছেন, এবছর পেঁয়াজের গুটির (বীজ) দাম না হয় একটু কম, কিন্তু জমি লিজ নেওয়া, সেটা চাষের জন্য তৈরি করা, সার, ওষুধ, সেচ, শ্রমিকের মজুরি—এই সবকিছুর দাম এতোটাই বেড়ে গেছে যে, তাদের মোট খরচ ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে। তারপরও, লাভের একটা আশা নিয়েই তারা চাষটা করছেন। তাদের দাবি একটাই—চাষের উপকরণের যে দাম, তাতে কৃষককে যদি বাঁচাতে হয়, তাহলে পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমে প্রতি মণের দাম যেন কমপক্ষে ২ হাজার টাকা রাখা হয়। যদি কোনো বড় দুর্যোগ (বিপর্যয়) না ঘটে, তবে চাষিরা আশা করছেন এবার প্রতি বিঘায় ৫০ থেকে ৬০ মণ পেঁয়াজ পাওয়া যাবে।
এ বছর, এই অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই জেলার বিভিন্ন মাঠে ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ লাগানো শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে যতখানি জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার প্রায় অর্ধেকটাতেই লাগানো শেষ হয়ে গেছে। এবার জেলায় সবচেয়ে বেশি এই পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে গোয়ালন্দ, কালুখালী আর বালিয়াকান্দিতে। অবশ্য, রাজবাড়ী সদর আর পাংশাতেও চাষিরা এই পেঁয়াজ লাগাচ্ছেন। এই ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ তুলে ফেলার ঠিক আগমুহূর্তে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারি মাস থেকে, আবার ‘হালি’ পেঁয়াজের (যেটা পরে হয়) আবাদ শুরু হবে।
খবর নিয়ে জানা যায়, পেঁয়াজ চাষের জন্য রাজবাড়ী বেশ নামকরা একটা জেলা। সারা দেশে মোট যে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তার প্রায় ১৬ শতাংশই আসে এখান থেকে। পেঁয়াজ উৎপাদনে এই জেলা দেশের মধ্যে তৃতীয়। ফলে, দেশের চাহিদার একটা বড় অংশই রাজবাড়ীর পেঁয়াজ দিয়ে মেটানো হয়। এখানে সাধারণত দুই ধরনের পেঁয়াজ চাষ হয়—এক, শীতের শুরুতে ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ, যেটা কম সময় রাখা যায়; আর দুই, ‘হালি’ পেঁয়াজ, যেটা প্রায় সারাবছর ধরে সংরক্ষণ করা যায়। জেলায় মোট যে পেঁয়াজ চাষ হয়, তার ৬ ভাগের এক ভাগ হলো এই ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ। যদিও জেলার ৫টা উপজেলাতেই এটা কমবেশি চাষ হয়, তবে গোয়ালন্দ, কালুখালী আর বালিয়াকান্দিতেই এর চাষ সবচেয়ে বেশি।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এবার জেলায় মোট ৩৬ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে পেঁয়াজ চাষের একটা লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮৭০ হেক্টর জমিতে। আর এই ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার মেট্রিক টন। হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, এবার গোয়ালন্দে ২,২৩০ হেক্টর, কালুখালীতে ১,৬৬৫ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ১,২০০ হেক্টর, পাংশায় ৪২৫ হেক্টর আর রাজবাড়ী সদরে ৩৫৫ হেক্টর জমিতে এই ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে।
কৃষক হালিম শেখ ‘জাগো নিউজ’-কে বলেছেন, ‘আমি এবার ৬ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ লাগিয়েছি। সার, ওষুধ, তেল, শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দামই অনেক বেশি। সব মিলিয়ে আমার প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে যাচ্ছে। যদি সারের দামটা একটু কম হতো আর পেঁয়াজ ওঠার পর যদি মণে ২ হাজার টাকা দাম পেতাম, তাহলে হয়তো কিছুটা লাভ হতো। কিন্তু দাম যদি ২ হাজার টাকার নিচে নামে, তাহলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।’
আরেকজন কৃষক, ঈসা, ‘জাগো নিউজ’-কে বলেন, ‘এখন এই পেঁয়াজ-রসুন লাগাতে গিয়ে আমরা একরকম অসহায় হয়ে পড়েছি। পেঁয়াজের গুটিই (বীজ) আমাদের কিনতে হচ্ছে ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা মণ দরে। অথচ, যখন আমরা পেঁয়াজ বিক্রি করি, তখন দাম পাই ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়তি, তাতে যদি কপাল গুণে ফলন ভালো না হয়, তাহলে আমরা একেবারে শেষ হয়ে যাবো। এবার যে কী পরিমাণ ফলন হবে, তা তো ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আশা করছি ভালোই হবে। যদি ভালো হয়, তাহলে বিঘায় ৫০-৬০ মণ পেঁয়াজ পাবো। আর যদি খারাপ হয়, ৩০-৩৫ মণের বেশি হবে না। তখন যদি আবার দামও না পাই, তাহলে আমাদের অবস্থা যে কী হবে, তা ভাবতেও ভয় লাগছে।’
কাদের মোল্লা আর হাসেম আলী শেখ নামের আরও দুজন কৃষক ‘জাগো নিউজ’-কে বলেন, ‘এবার পেঁয়াজ চাষে খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। জমি, সার, তেল, লাঙল (চাষ) সবকিছুর দাম চড়া। কিন্তু আমরা যখন জিনিস বিক্রি করতে যাই, তখন আর দাম পাই না। সব মিলিয়ে এবার এক বিঘা জমিতেই প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।’
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ অফিসার গোলাম রাসূল ‘জাগো নিউজ’-কে বলেছেন, ‘জেলায় এখন ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ লাগানোর কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সব জমিতে লাগানো শেষ হয়ে যাবে। আবহাওয়া যদি ভালো থাকে (অনুকূলে থাকে), তাহলে আমরা আশা করছি যে, এ বছর জেলায় প্রায় ৯৫ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জেলায় সারের কোনো অভাব নেই, পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত আছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে নজরদারিও (মনিটরিং) বাড়িয়েছি। আগামী মাসে সারের বরাদ্দ আরও বেশি আসবে। ফলে, সার নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এরপরেও যদি আমরা কোথাও কোনো অভিযোগ পাই, তাহলে সেটা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
রিপোর্টারের নাম 

























