ভৌগলিক কারণে অর্থকরী ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারালেও বিকল্প ফসল উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে পঞ্চগড়ের চাষিরা। পরিবেশ উপযোগী, ঝুকি কম এবং উৎপাদন খরচ সীমিত পক্ষান্তরে অধিক মুনাফা নিশ্চিত হয়ে পঞ্চগড়ের চাষিরা ঝুকে পড়েছে উচ্চ ফলনশীল বাদাম চাষে।
এখানে নদীর চর, পরিত্যাক্ত চারণ ভূমি আর খালি পড়ে নেই । প্রযুক্তিগত ধারণা, ঋণ সুবিধাসহ উৎপাদিত পণ্যের সুষ্ঠু বাজারজাত ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে জেলার উৎপাদিত বাদাম গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে ।
পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের দুই মৌসুমে ব্যাপক আকারে চাষ হচ্ছে উচ্চ ফলনশীল বাদাম। বিশেষ করে জেলার দেবীগজ্ঞ সদর এবং বোদা উপজেলায় এই বাদাম চাষ বর্তমানে কৃষিতে নতুন এক বিপ্লব এনে দিয়েছে ।

কৃষকরা জানায়, বিঘা প্রতি ৬ হাজার টাকা খরচ করে এক বিঘাতেই ১২ মণ বাদাম উৎপাদন সম্ভব। সাইজে আর্কষণীয় হবার কারণে প্রতিমণ বাদামের পাইকারি মূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা। স্বল্প খরচে অধিক মুনাফায় এই বাদম চাষ চাষিদের সাবলম্বী করে তুলেছে। তবে চলতি বছরে অনাবৃষ্টি এবং তীব্র তাপদাহের কারণে ফলনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সুষ্ঠু বাজার জাত, আর্থিক সহায়তা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় বাড়তি লাভের বিষয়ে কিছুটা হতাশ চাষিরা ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিজেরাই বাদম কিনে সারাবছর জুড়ে খোসা ছড়িয়ে তা বিক্রি করছে। দেশের নাম করা কোম্পানিসহ অনেক ছোট কারখানা থেকে অর্ডার নিয়ে মান সন্মত বাদাম দানা সরবরাহ করছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ফলে এসব কারখানায় খোসা ছড়ানোর কাজসহ বাছাই, প্যাকেট জাত এবং কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে বাদামের জমিতে নিড়ানিসহ খোসা ছড়ানোর কাজ করে উপার্যিত অর্থ পেয়ে সাবলম্বী।

জেলার বোদা এবং দেবীগঞ্জ এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক বাদাম খোসানো কারখানা। এনজিওসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে চলছে এসব কারখানা। পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার ময়দানদিঘি এলাকায় অবস্থিত বাদাম ঘরের মালিক আনিসুর রহমান জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি বাদামের কারখানা চালিয়ে আসছেন, নিজের স্বল্প পুজি এবং এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে তোলা তার এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে এলাকার প্রায় ১৫ জন মানুষ এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী শ্রমিক। দেশের নানাস্থান থেকে ব্যবসায়ীরা তাকে ফোনের মাধ্যমে মালের চাহিদা দিলে খোসা ছড়িয়ে বাদাম দানা সরবরাহ করেন তিনি। সারা বছরেই তার কারখানা চলে। এতে করে কারখানার খরচ, শ্রমিকের বেতন দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে তার ভালই চলে।
কারখানার মালিক সুয়েজার রহমান সুয়েজ জানান, বাদামকে ঘিরে এ জেলার কৃষি অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছে যাদের আগ্রহ রয়েছে কিন্ত আর্থিক সংকটের কারণ তারা কারখানা গড়তে পারছে না। স্বল্প সুদে কৃষি ঋণসহ বিপন্ন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে এই শিল্পটি এগিয়ে যাবে।
বাদম কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিক জয়নব, মরিয়ম আলেয়া জানান, সংসারের কাজকর্ম শেষ করে কারখানায় এসে বাদাম দানা বাছাইয়ের কাজ করেন তারা। কাজ শেষে যে মজুরি পায় তা সংসারের বাড়তি আয় হিসেবে অনেক কাজে আসে ।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে চাষিদের স্থানীয় জাতের বীজ সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তাসহ নানা পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এর ফলে ক্রমাগতভাবে উৎপাদন বাড়ছে । চলতি বছরে আবহাওয়া বিপর্যয়ের কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। দাম ভাল পেলে পঞ্চগড়ের উৎপাদিত বাদাম এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে মাইল ফলক হিসেবে কাজ করবে এমনটি জানালেন কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল মতিন। তিনি জানান, উৎপাদনমুখি এই বাদাম চাষের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি সচ্ছলতাও ফিরেছে প্রান্তিক চাষিদের মাঝে।
রিপোর্টারের নাম 

























