মুক্ত অর্থনীতির সংকুচিত অবস্থান এবং মার্কিন আধিপত্যবাদের বিস্তারের মুখে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশসহ আটটি সদস্য দেশ নিয়ে গঠিত এই সংস্থাটি বর্তমানে কার্যত স্থবির হয়ে থাকলেও অরাজনৈতিক এই জোটকে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সার্কের সুপ্ত সম্ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেশগুলোর প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎকালে প্রতিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সার্ক পুনর্জীবনের আবশ্যকতা। তিনি মনে করেন, এই জানাজায় আঞ্চলিক নেতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে সার্কের চেতনা এখনো অমলিন এবং দক্ষিণ এশিয়ার দুই বিলিয়ন মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি সক্রিয় করা এখন সময়ের দাবি।
সার্কের সূচনালগ্নে বাংলাদেশের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা স্মরণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯৮৫ সালে এই সংস্থার প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডু সম্মেলনের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক তিক্ততা ও আস্থাহীনতার কারণে সংস্থাটি অচল হয়ে পড়ে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও ভারতের আপত্তিতে তা পণ্ড হয়। বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক রক্ষণশীলতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নিজেদের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কানেক্টিভিটি, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ব্লু-ইকোনমির সুরক্ষায় সার্ককে সক্রিয় করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির।
সার্কের এই দীর্ঘমেয়াদী নিষ্ক্রিয়তার জন্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ভারতের অনীহা এবং দেশটির ‘অখণ্ড ভারত’ মানচিত্রের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোকে দায়ী করছেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহর মতে, ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব সার্কের ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলেছে এবং ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই জোট পুনর্জীবিত হওয়া কঠিন। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান মনে করেন, ভারত যদি সার্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে চীনকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের দেশগুলো ব্রিকসের আদলে নতুন কোনো জোটে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত এই জোটটি কেবল একটি সংস্থাই নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 






















