৭
৮ নভেম্বর ১৯৮৭, সন্ধ্যা ৬টা ২৫
‘আমার নাম মোকাম,’ মাথা থেকে আদর্শলিপির গল্প ঠেলে সরিয়ে মোকাম হাসি হাসি মুখে আলাপ শুরু করে। ‘সকালবেলায় আপনার সঙ্গে কথাবার্তার তেমন সুযোগ পাইনি। অফিসের তাড়া ছিল। তারপর সারা দিন ধরে আপনার কথাই ভেবেছি। ভেবেছি আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে কি না, আলাপের সুযোগ হবে কি না। এখন দেখা হয়ে গেল, সত্যিই অনেক ভালো লাগছে।’
মোকামের কণ্ঠ মোলায়েম শোনায়। লড়াই করার মতো কোনো শক্তি তার শরীরে অবশিষ্ট নেই। ভালোবাসা হলো সুফিপন্থার মূল। প্রাণে বাঁচবার জন্য এখন তাকে সুফি দরবেশদের ভালোবাসার রাস্তায়ই হাঁটতে হবে। বেঁচে থাকতে হলে তাকে যদি কালান্দারি মার্ক্সবাদীতে পরিণত হতে হয়, সে তা-ই হবে।
‘জি, জানি স্যার, আপনার নাম মোকাম,’ টিকটিকিও হাসিমুখে বলে। ‘আমি আপনের রুমমেট। এই ঘরেরই বাসিন্দা। বাথরুমে থাকি। আপনার ইয়াদ নাই হয়তো, বাথরুমের ভিতরে আমার লগে আপনার দেখা হইছে বহুবার। আইজ হাওয়াবদল করবার লিগা বাইর হইছিলাম বাথরুম থিকা, তাও অল্প কিছুক্ষণের জন্য। ব্যস, অমনেই আপনের লগে দেখা হইয়া গেল।’
মোকাম থতমত খেয়ে যায়। এমনিতে একটা টিকটিকি স্রেফ একটা টিকটিকিই। কিন্তু মানুষের সমান লম্বা-চওড়া, দামড়া একটা প্রাণী যখন নিজেকে টিকটিকি বলে দাবি করে, দুই পায়ে হাঁটে, কথা বলে মানুষের ভাষায় এবং এ-ও বলে যে বাথরুমে সে বহুবার দেখেছে তাকে, তখন কচু খাওয়ার পর গলা যেমন খুসখুস করতে থাকে, তেমন একটা উসখুস উসখুস ভাব মনের ভেতর জেগে ওঠে। বাথরুমে এত দিন ধরে এই প্রাণীটা তাকে ন্যাংটো অবস্থায় দেখেছে, এ জ্ঞান অর্জন মোকামের জীবনকে আরও সহজ করে তোলার কোনো কারণ নেই।
টিকটিকি তার সপাং সপাং নড়তে থাকা লেজ হাতের মুঠোয় পুরে ফেলে খপ করে। তারপর লেজের ডগা তার পুঁতির মতো কুতকুতে কালো চোখের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। গভীর অভিনিবেশের সাথে অনেকটা সময় নিয়ে লেজটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর লেজের ডগায় সুড়ুত সুড়ুত করে চাটা দেয় কয়েকবার। আঙুল দিয়ে টেনে ডগাটা আরও সুচালো করে ছেড়ে দেয় আগের অবস্থায়। লেজ ডানে-বামে দোল খেতে থাকে।
‘আমার শরীর ঢাকবার জন্য কিছু একটা দেওয়া যায়, স্যার? আপনার মতো এক শরিফ আদমির সামনে এ রকম ল্যাংটা হইয়া চলাফিরা করতেছি, শরম লাগতেছে।’
টিকটিকির লাজুক আবদারে মোকাম বিপদে পড়ে। জামাকাপড় নিয়ে তার কোনো শৌখিনতা নেই। আলনাতে আছে কেবল এক সেট পায়জামা-পাঞ্জাবি, পত্রিকা অফিসে পরে যাওয়ার জন্য দুই সেট শার্ট-প্যান্ট। আর বাসায় পরবার জন্য দুটো লুঙ্গি আর গেঞ্জি। এমতাবস্থায় এ টিকটিকিকে শরীর ঢাকবার জন্য কী দেওয়া যায়?
মোকাম সাতপাঁচ ভেবে আলনা থেকে শুধু পায়জামাটা তুলে আনে।
টিকটিকি প্রথমে চেষ্টা করে দাঁড়িয়ে পায়জামার ভেতরে তার ছোট ছোট এবং বাঁকা পা দুটো ঢোকাতে। লাভ হয় না। মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে বেঁচে যায় কোনোক্রমে। মোকামের শরীরের মাপে বানানো পায়জামায় স্বাভাবিকভাবেই সে কুলিয়ে উঠতে পারে না। একপর্যায়ে পায়জামা হাতে সে বসে পড়ে। লম্বা একটা সময় ধরে নানা রকম কসরত শেষে কোনোমতে পা দুটো পায়জামাতে ঢোকাতে সক্ষম হবার পর দেখা যায়, তার লেজখানা আর ঢুকছে না। লেজের কারণে গোটা পায়জামাও আর ওপরে ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না। জিনিসটাকে যে বাইরে বের করে রাখবে, সেটাও পারা যাচ্ছে না।
‘কাইন্ডলি একটু কাছে আসেন, স্যার, ব্যালান্স করতে সমস্যা হইতেছে,’ টিকটিকির কণ্ঠে অসহায়ত্ব। সম্ভবত মোকামের ঘাড়ে ভর দিয়ে পায়জামা পরতে চাইছে। টিকটিকির আহ্বানে মোকামের সাড়া দেওয়ার সাহস হয় না। কিম্ভূতকিমাকার এক জন্তু। কে জানে, কামড়ে বা খামচে দেয় কি না। মোকাম চিন্তাভাবনা করে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় ওর দিকে। লেজ নিয়ে বেদিশা টিকটিকি তাতে মনঃক্ষুণ্ন হয় কি না, বোঝা যায় না। এক হাতে সেই চেয়ারের মাথা আঁকড়ে ধরে অন্য হাতে পুনরায় পায়জামা নিয়ে কসরত করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর ঠেলেঠুলে সে তার লেজটা পায়জামার একটা পায়ার ভেতর গলিয়ে দিতে সক্ষম হয়। লম্বা সে লেজের মাথা বেরিয়ে থাকে পায়জামার নিচে। সবশেষে ঘুরে এক পা হাঁটার চেষ্টা করতেই দড়াম করে টিকটিকি মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে পড়লে মোকাম নিজের ভুল বুঝতে পারে। এত ছোট পায়ের একটা প্রাণীকে তার এ পায়জামা পরতে দেওয়া উচিত হয়নি। টিকটিকি মনে হয় ভালোই ব্যথা পেয়েছে। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে আস্তে আস্তে উঠে বসে ওটা।
‘স্যার, এই জিনিস দিয়া তো লজ্জা নিবারণ হইতেছে না।’
লজ্জা নিবারণ! টিকটিকির বোমফাটানো শব্দচয়নে মোকাম আরও একবার বিষম খায়। কিন্তু তার নিজের ভুলে আঘাতপ্রাপ্ত প্রাণীটার সঙ্গে কোনো রূঢ় রসিকতা করতে ইচ্ছা হয় না। বরং সে আলনা থেকে তার একটা লুঙ্গি এনে ওর হাতে দেয়। টিকটিকি বসে বসেই কাপড়টা নেড়েচেড়ে দেখে। তারপর ব্যথা ভুলে বা চেপে রেখে উঠে দাঁড়ায়।
লুঙ্গিটার ব্যবহারে একটু বিহ্বল লাগে ওকে। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে সে সুপারম্যানের কায়দায় লুঙ্গি গলার সঙ্গে গিঁট মেরে বেঁধে পেছনে ঝুলিয়ে দেয়। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় মোকামের দিকে। মোকাম চোখের ইশারায় বোঝায়, এতেও তার ‘লজ্জা নিবারণ’ হচ্ছে না। এবারে সে গলার বদলে ঘাড়ের দিকে লুঙ্গি গিঁট মেরে তার বুক-পেটসহ শরীরের সামনের দিকটা ঢেকে ফেলে। ফলে উদাম হয়ে পড়ে তার পেছনের দিকটা। একজন সজ্জন ভদ্রলোকের সামনে বেআবরু হয়েই দিন গুজরান করতে হবে, দৃষ্টিতে এ রকম এক অসহায় চাহনি নিয়ে সে মোকামের দিকে তাকালে মোকাম অবশেষে তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। মোকামের মৌখিক নির্দেশনা অনুসরণ করে সে নিজের উচ্চতার সঙ্গে মিলিয়ে বুকের ওপর একটা গিঁট মেরে লুঙ্গি পরতে সক্ষম হয়।
‘উফ্ফফ!’ টিকটিকি এই নতুন পোশাককে সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনার জন্য তার কোমর প্রথমে সামনে পিছে—সামনে পিছে, তারপর ডানে-বামে—ডানে-বামে এবং সবশেষে চক্রাকারে দোলাতে থাকে। ‘ভিতরে দেখি অনেক বাতাস ঢুকতেছে! দারুণ আরাম!’
‘লুঙ্গি খুব আরামের পোশাক,’ মোকাম ছোট করে বলে।
‘হ স্যার, তাই তো দেখতেছি…’ টিকটিকি লুঙ্গির গিঁট খুলে আবারও শক্ত করে কাছা মারতে মারতে বলে, ‘কী জানি কইতেছিলাম?’
তারপর আবারও তার গল্প শুরু হয়।
‘তো আপনের পায়ের আওয়াজে ঘাবড়ায়া তব্দা খাইলাম। ভাবলাম, যেমন তুর তুর কইরা উপরে উঠছি, অমনেই বাথরুমের ভিতরে গিয়া সান্ধাই আবার। তাড়াহুড়া করতে গিয়া বাড়ি খাইলাম ছাদে ঝুলানো পাঙ্খার লগে। লগে লগে ধপ্পাস। আমি এক দিকে, আমার ল্যাঞ্জা আরেক দিকে। ভাবলাম গইড় দেই। গইড়ানি দিয়া হইলেও সান্ধাই গিয়া বাথরুমে। কপালের ফের, আপনে এত তরাসে কামরায় আয়া ঢুকলেন যে আমি আর কিছু করার সুযোগ পাইলাম না। সটান খাড়ায়া পড়লাম দেয়াল ঘেঁইষা।’ লেজে দুটো দোল খাইয়ে টিকটিকি আবারও বলে, ‘এহন তো মনে লয় ভালোই হইছে ব্যাপারটা। আপনার লগে চিনপরিচয়, আলাপসালাপের সুযোগ হইল। নইলে মনে করেন, বাথরুমের ভিতরে যে অবস্থায় আমাগো দেখা হয়, ওই অবস্থায় তো আর গপসপ করা যায় না।’
টিকটিকি ফিক করে হেসে দেয়, ‘আমারে সেরেফ খাড়ায়া থাকতে দেইখাই যে ডর খায়া গেছেন, সিলিংয়ে চিপকায়া থাকতে দেখলে তো মনে লয় ডরের ঠ্যালায় কী করতেন, বুইঝা উঠার পারতেন না। হার্ট অ্যাটাক হইতে পারত। হয়তো লৌড়ায়া জানালা দিয়া বাইরে জাম্প করতেন।’
‘না না, ভয় না,’ মোকাম ঢোঁক গেলে, ‘চমকে গিয়েছিলাম একটু। তা আপনি ঠিক আছেন এখন? এত উপর থেকে পড়ে গেলেন…’
‘স্যার, আমারে উত্তম পুরুষে সম্ভাষণ করতেছেন কেন?’ টিকটিকি ক্ষুণ্ন কণ্ঠে বলে। ‘টিটকারি মারতেছেন আমারে?’
উত্তম পুরুষে সম্ভাষণ! টিকটিকির শব্দবোমায় পুনঃ আহত মোকাম এবার খুব কষ্ট করে ঢোঁক গেলে। এ কেমন প্রাণী? নামে টিকটিকি, কিন্তু উচ্চতায়-ঘাড়ে-গর্দানে-কথাবার্তায়-চালচলনে আবার মানুষের মতো। মানুষের মতো দুপায়ে হাঁটলেও পেছনে একখানা মর্তমান লেজ দুলতে থাকতে টিংটিং করে। মুখের ভাষা কখনো মিশ্র ঢাকাইয়া, কখনো কেতাবি। এই ঝামেলাগুলো বাদে এমনিতে টিকটিকির সম্ভাষণজনিত যে প্রস্তাব, তাতে মোকামের কোনো আপত্তি থাকার কারণ নেই। সে ওকে আপনি করে সম্বোধন করছে—নিজে ভয় পেয়েছে বলে নয়। মোকাম আসলে তার অপরিচিত-অর্ধপরিচিত সবাইকে আপনি বলেই আলাপ শুরু করে। সাথে সে এ আশাও করে যে অপরিচিত-অর্ধপরিচিত মানুষরাও তাকে প্রথম সাক্ষাতে আপনি করেই বলবে। চেনা নেই জানা নেই, এমন মানুষের মুখে আচমকা তুই-তুমি তার একেবারেই অপছন্দনীয়।
‘টিটকারি না,’ মোকাম ক্ষীণ স্বরে বলে। ‘আগে থেকে পরিচয় নেই, এমন যে কাউকে আপনি বলাটা আমার অভ্যাস।’
টিকটিকি সমঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। এদিকে মোকামের পেটের ভেতর হাঁড়ির ফুটন্ত চালের মতো ভুটভুটিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে অনেকানেক প্রশ্ন। সে বুঝতে পারে না যে প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসার সঠিক সময় এটা কি না, টিকটিকি সকালের সহিংসতা এখনো ভুলতে পেরেছে কি না, মোকামকে ক্ষমা করেছে কি না। এমনিতেও গত কিছুদিন ধরে রাতে তার ঘুম হচ্ছে ছাড়া ছাড়া। ঘুমের অভাবে সে হ্যালুসিনেট করছে কি না, এটাও সে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ঘুমহীনতার ফলে সত্যিই কি এতটা ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় সে পৌঁছে গেছে এর মধ্যে? কয়েক রাত ভালো ঘুম না হলেই যে মানুষের চোখের সামনে পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা কমোডো ড্রাগন এসে নৃত্য আরম্ভ করে, তা তো নয়। তা ছাড়া একটা ঘরোয়া টিকটিকি কি আদৌ এত বড় হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রেও মোকামের অভিজ্ঞতার জগৎ তাকে খুব বেশি সাহায্য করতে পারে না। পৃথিবীর অন্য সব সাধারণ মানুষের মতো মোকাম নিজেও জীবনে কখনোই খুব মনোযোগসহকারে খুঁটিয়ে টিকটিকি দেখেনি। দুনিয়াদারির ব্যাপারে নিজের জানাশোনার পরিধি নিয়েও সে বরাবরই সন্দিহান। কাজেই এক গৃহস্থ টিকটিকির এ রকম মানবীয় শারীরিক কাঠামো হতে পারে কি না, এ নিয়ে তার ভেতরে সন্দেহ কাজ করলেও সে সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়ার সাহস হয় না তার। থাকতেই পারে দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো টিকটিকি, যে মুখ খুললে ট্যাপের পানির মতো বাংলা ভাষা উপচে বেরোয়। সুবিশাল এই পৃথিবীর কতটুকুই-বা জানে সে!
কিন্তু, তাই বলে এমন ভালো বাংলা?
‘আমার জন্ম কিন্তু এই পাড়াতেই, স্যার। আমার ভাষাও তাই বাংলা,’ টিকটিকির কথায় মোকামের জীবনকে সহজ করে তোলার চেষ্টা। ‘কিন্তু আপনার বাসায় আইসা আশ্রয় নেওয়ার আগে আমি কবি নজরুল কলেজের এক বাংলার অধ্যাপকের বাসায় ছিলাম কিছুদিন। ভদ্রলোকের বাতিক আছিল, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া হইলে মাঝরাত্তিরে চিক্কুর পাইড়া বাংলা কবিতা আবৃত্তি করা। ওনার আবৃত্তি শুইনা শুইনা আমি ওই রকম দুই-চাইরটা বম্বাস্টিং বাংলা শিখছি।’
এরপর টিকটিকি খুব আবেগের সাথে আবৃত্তি করা আরম্ভ করে:
‘হামার জানুতে দ্যাখ বলবান পেশি আসি যায়,
হামার শরীলে দ্যাখ শক্তির তরঙ্গ লাফায়,
যায়, এই ছুটি যায়,
ডাক ভাঙ্গি যায়,
পশু নয়, মানুষের কণ্ঠের ভাষায়—
“জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়।”’
শেষ বাক্যের উচ্চারণে টিকটিকির শরীর তরঙ্গের মতো কাঁপতে থাকে। এ রকম কিম্ভূতকিমাকার উপায়ে কম্পনশীল কোনো প্রাণী মোকাম তার ইহজীবনে চোখে দেখেনি।
‘আপনি আমার মনের কথা…’ টিকটিকি স্থির হবার পর মোকাম পুনরায় আমতা-আমতা করে কথা বলার চেষ্টা করে।
‘না, স্যার, পড়তে পারি না, আন্দাজ করলাম আরকি। কথ্য বাংলার মধ্যে হঠাৎ দুই-একটা প্রমিত বাংলা উচ্চারণ করলে নিজের কানেই ঠাং কইরা বাড়ি মারে, আপনার আর কী দোষ দিব,’ টিকটিকি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে। ‘আর আপনি মেহেরবানি কইরা আমারে আপনে আজ্ঞে করা বন্ধ করেন। মর্যাদা আর বয়সে আমি আপনের থিকা অনেক ছোট।’
মর্যাদার ব্যাপারটা মোকাম মানতে পারে, কিন্তু বয়সের আলাপ ওঠায় সে খানিকটা কষ্ট পায়। বয়স তার অমন বেশি কিছু না, কেবল সিঁথির দিক থেকে কিছুটা হালকা হয়ে আসা চুল তার সঙ্গে বিট্রে করেছে। যার কারণে তাকে বয়সের অনুপাতে খানিকটা বুড়োই লাগে।
‘আর সকালবেলা উপর থিকা বেমক্কা পইড়া গিয়া ব্যথাও কিছুটা পাইছি, মিথ্যা কমু না। এমনিতেও মিথ্যা কওন আমাদিগের জীবনাচারে নাই। আমরা টিকটিকিরা সইত্যের ফেরিওয়ালা। সইত্যরে বুকের গহিনে ধারণ করি। সইত্য বলি। সইত্যের প্রচার এবং প্রসার করি। যেমন চিন্তা কইরা দেখেন, আপনের কথার ফাঁকে কোনো টিকটিকিরে টিক টিক টিক কইরা ডাইকা উঠতে শোনেন নাই কখনো?’
মোকাম টিকটিকির প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ে। জীবনে বহুবার সে শুনেছে টিকটিকির এ ডাক। আলাপের ফাঁকে, এমনকি নৈঃশব্দ্যেও।
‘আপনে সম্ভবত কখনো ভালোমতো খিয়াল করেন নাই। আল্লার এই জমিনের উপর আর আসমানের নিচে খাড়ায়া কেউ যখন সইত্য কথা বলে, তখন আশপাশে কোনো টিকটিকি থাকলে ধর্মত তার দায়িত্ব হবে সজোরে টিকটিক কইরা উইঠা সেই সইত্যবাদীরে নৈতিক সমর্থন দেওয়া। এইটা টিকটিকি সমাজের অমোঘ, বর্জ্যকঠিন, অপরিবর্তনীয় নিয়ম,’ (টিকটিকি এত উত্তেজিত ভঙ্গিতে সামনের হাত কিংবা পা নাড়িয়ে কথা বলতে থাকে, নিয়মিত প্রুফরিড করা মোকামের কানে ঠং করে এসে শব্দটা বাড়ি দিলেও সে সুযোগ পায় না শব্দটা যে বর্জ্যকঠিন নয়, বজ্রকঠিন—সে ভুল শুধরে দেবার) ‘এইটা আমাদের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম যে যখনই আমাদের সামনে কেউ সইত্য কথা কইব, আমরা তারে টিকটিক টিকটিক কইরা মোরাল সাপোর্ট দিমু, এইভাবে— ‘টিকটিকি বক্তৃতা দেওয়ার ভঙ্গিতে গ্রীবা শক্ত করে সজোরে ডেকে ওঠে—
টিইইইক!
টিইইইইইইক!!
টিইইইইইইইইইইইইইইইইইইক্ক!
তৃতীয়বার টিকটিকিয়ে ওঠার সময় উত্তেজিত টিকটিকি তার হাতের আঙুল মুঠো পাকিয়ে সজোরে ঘোরাতে থাকে মাথার ওপরে। লুঙ্গির আড়ালে তার লেজ উত্থিত লিঙ্গের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং কাঁপতে থাকে। কামরায় উপস্থিত মোকামের সামান্য যে আসবাব, বিশেষ করে শোকেসের কাচ ঝনঝন ঝনঝন করে কেঁপে ওঠে টিকটিকির আওয়াজের তীক্ষ্ণতায় কিছুটা সময় নিয়ে টিকটিকি স্বাভাবিক হয়। তারপর সে স্বাভাবিক সুরে পুনরায় কথা বলতে আরম্ভ করে, ‘উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেওয়ার সময় থপ কইরা পইড়া অল্প একটু গড়ায়া যাওয়াটাই নিয়ম। আমাদের হাতের তালু তো খোদায় এমনে বানাইছে যে আমরা চাইলেই যেকোনো তলে ঝুইলা থাকতে পারি। আর উঁচু জায়গা থিকা লাফ দেওয়ার সময়ও আমাদের এই স্পেশাল তালু দিয়া আমরা চিপকাইয়া যাইতেও পারি মেঝের সাথে। কাজেই তেমন কোনো রিস্ক থাকে না। সমস্যা হয় যখন লাফ দিয়া অপেক্ষাকৃত কম দূরত্ব অতিক্রম করা লাগে। তখন আর গইড়ানিও দেওয়া যায় না, এদিকে হাতের গ্রিপও সুবিধামতো পাওয়া যায় না।’
আলোচনা সাইকোলজি থেকে মোরালিটি হয়ে ফিজিকসের দিকে গড়ালে মোকাম খেই হারিয়ে ফেলে। সায়েন্সের সাবজেক্টগুলোতে সে একদম ছোটবেলা থেকেই কাঁচা। পত্রিকা অফিসের কলিগদের সাথে যাপিতজীবনের জটিলতাসংক্রান্ত আড্ডায় সে মাঝে মাঝে এ কথা বলে যে ছোটবেলাটাই ভালো ছিল, যখন জীবনে প্যারা বলতে কেবল ম্যাথ, ফিজিকস, বা কেমিস্ট্রি পরীক্ষাই বোঝাত। তবে সত্যি কথা হলো, মোকাম কোনোভাবেই পুনরায় সায়েন্সের পরীক্ষার হলে ফেরত যেতে চায় না, তা বর্তমান জীবন তার যত জটিলই হোক না কেন। তা ছাড়া এই লাফালাফির প্রসঙ্গ কোন সূত্রে তাদের আলাপের মাঝে এসে প্রবেশ করল, মোকাম সেটাও বুঝতে পারছে না। তাকে ব্লু ধরিয়ে দেবার জন্যই সম্ভবত টিকটিকি আলাপ একটু পেছন দিকে নিয়ে যায়।
‘না, ওই যে সকালে আমারে বাড়ি মারার জন্য খাটিয়ার উপর লাফায়া উঠতে গিয়া উষ্টা খাইলেন। খাটিয়ার একটা পায়া আগে থিকাই ভাঙা আছিল। আমি লাফ দিবার সময় গইড়ানি দিতে গিয়া ধ্রিম কইরা ধাক্কা খাইছি ওইটার একটা পায়ার লগে। পায়া ভাইঙ্গা গেছিলগা।’
মোকাম ভ্রু কুঁচকে তার কাত হয়ে থাকা খাটিয়ার দিকে তাকায়। সকালে এই বেকায়দায় থাকা খাটিয়ার কারণে টিকটিকির সঙ্গে তার লড়াইয়ে একটা চরম মুহূর্তে পুরো পাশার দান উল্টে গেল। তা ছাড়া আজ রাতে সে এই কাত হয়ে থাকা খাটিয়ায় ঘুমাবে কীভাবে, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। খাটিয়ার ভাঙা পা নিজে নিজে সারাই করার উপায় তার জানা নেই। অন্য কাউকে দিয়ে যে সারাই করাবে, তার জন্য প্রয়োজনীয় টাকাকড়িও নেই তার কাছে। বেতনের রেগুলার সময় পেরিয়ে গোটা মাস পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পত্রিকা অফিসের ক্যাশিয়ার শালা এখনো প্রতিদিন কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীর মতো চেহারা বানিয়ে বসে থাকে, যেন বেতন ওর পাছা দিয়ে বেরোবে। বিরক্ত মোকামের কোঁচকানো ভ্রু আর সোজা হয় না।
‘আপনি এখানে কেন? কী চান আপনি আমার কাছে?’ বিনা দায়ে অর্থ খরচার যন্ত্রণা মোকামের কণ্ঠে ঝাঁজ হয়ে ঠিকরে বেরোয়।
‘স্যার, সামান্য টিকটিকি আমি…’
‘আরে, রাখেন আপনার সামান্য টিকটিকি, সামান্য টিকটিকি!’ মোকাম তেজের সঙ্গে বলে। ‘এই সামান্য টিকটিকি হয়েই তো আমার এত বড় ক্ষতিটা করলেন। বাপ-দাদার আমলের পুরোনো খাট, ভেঙে ফেললেন এককথায়। রাতে এখন আমি ঘুমাব কোথায়? সিলিংয়ে চিপকায়ে? হাতের তালুতে আঠা আছে আমার, টিকটিকিদের মতো?’
ঝাড়ি দেওয়ার পর মোকামের মনে পড়ে, রাত্রে তার এমনিতেও ভালো ঘুম হয় না। আজ রাতে মেরামত করা খাটিয়াতে শুলেও যে তার চোখ ভেঙে ঘুম আসবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে এই অদ্ভুতদর্শন জন্তুটাকে চাপে রাখতে হলে তার এই রাগী রাগী ভঙ্গি ধরে রাখা প্রয়োজন। খাটিয়ার ভাঙা পা তার ভেতরে একদম অর্গানিক রাগের জন্ম দিয়েছে। অভিনয় করা লাগছে না।
‘তা নাই, স্যার,’ টিকটিকি হাসিমুখে বলে। ‘আর হাতে আঠা থাকলেও আপনারে আমার লগে ছাদে চিপকায়া ঘুমানো লাগত না।’
টিকটিকি সহমর্মিতার সঙ্গে এগিয়ে এসে মোকামের কাঁধে হাত রাখতে গেলে মোকাম ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায় দুকদম।
‘খাটিয়ার মতো তুচ্ছ জিনিস নিয়া আপনে চিন্তা করবেন কেন, স্যার? তুচ্ছ বস্তু নিয়া চিন্তা করব আমরা, তুচ্ছ জীবেরা। আপনে হইলেন গিয়া মানুষ। আশরাফুল মাখলুকাত। আপনে চিন্তাও করবেন বড় বড় বিষয় নিয়া।’ টিকটিকির কণ্ঠে চাপা সাসপেন্স।
তুচ্ছ জীবেরা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিন্তা করবে, আর মোকাম স্রেফ মানুষ হবার কারণেই চিন্তা করবে বড় বড় বিষয় নিয়ে? মোকামের কপালে নতুন করে ভাঁজ পড়ে। মানুষ তো শালার এমন এক চুতিয়া জীব, দুনিয়ার যে জিনিসটা নিয়ে তলিয়ে ভাবতে গেছে, সেটার গোয়া মেরে ছেড়ে দিয়েছে। কাজেই নিজের দায়বদ্ধতার সংক্ষিপ্ত গণ্ডির বাইরে মানুষ যত কম চিন্তা করে, ততই জগৎ-সংসারের ভালো—এই হলো মোকামের মত। তা ছাড়া সে যে বড় বড় বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করবে, এমন বিষয়ই-বা কী আছে? মাঝারি মাপের এক দৈনিক পত্রিকায় সে মূলত প্রুফ দেখার কাজ করে। এই মাসখানেক হলো মাত্র, সম্পাদকের বদান্যতায় সে প্রতি মাসে কিছু ফিচার টাইপ লেখা লিখবার অ্যাসাইনমেন্ট পাচ্ছে, যার সূত্র ধরে মূল বেতনের সঙ্গে সামান্য কিছু উপরি যুক্ত হয়। আর এই পেশায় একটা নির্দিষ্ট গতি ধরে রেখে নিয়মিত কাজ করে গেলেই দিনের কাজ দিনে শেষ হয়ে যায়। জটিল কিংবা বড় বড় জিনিস নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা এমনিতেও তার দৈনন্দিন জীবনের রুটিনের মধ্যে পড়ে না।
‘তা কী সেই বড় বড় বিষয়?’ মোকাম সচেতনভাবে তার কণ্ঠে কিছুটা শ্লেষ যুক্ত করার চেষ্টা করলেও পারিপার্শ্বিকতার বিবেচনায় প্রশ্নটা বেশ সিরিয়াস ঠেকে।
‘আপাতত, স্যার, আজকের রাতের ডিনার নিয়াই চিন্তাভাবনা করা যাক।’ টিকটিকির ঠোঁটের কোণে ঝুলন্ত মিচকে হাসি রহস্যের জাল বিছিয়ে রাখে রুমজুড়ে।
***
‘আমার, স্যার, খাওনের রুচি আউলাঝাউলা হয়া গেছে,’ টিকটিকি গালে হাত দিয়ে মেঝেতে আসন গেড়ে বসে পড়ে। ‘এমন এমন জিনিস খাইতে মন করতেছে, যা আগে কখনো খাই নাই, খাইতে ইচ্ছাও করে নাই কখনো। যেমন এই মুহূর্তে কেন জানি মনে হইতেছে, বারিষের শীত শীত রাতে ডিম-খিচুড়ি খাইবার পারলে জবর হইত।’ টিকটিকি দুহাত (বা দুই পা) কচলে বলে, ‘ভাইবা দেখেন একবার, আমি হইলাম টিকটিকি, আর খাইবার মন চাইতেছে মুরগির আন্ডা। কবে দেখবেন মুরগি দাবি করব মানুষের বাচ্চা খাইবার।’
টিকটিকির কথায় ভোঁতা একটা হুমকি আছে। কিন্তু মোকামের চোখ গিয়ে আটকায় টিকটিকির দেঁতো হাসিতে এবং সে বিস্মিত হয়। আবারও একবার তার মনে হয় যে সামনে দাঁড়ানো প্রাণীটার দাঁতগুলো একদম মানুষের দাঁতের মতো। কোনো সরীসৃপের দাঁত এমন হবার কথা নয়।
কোনো মানুষই কি টিকটিকি সেজে তার সঙ্গে মশকরা করছে?
‘অখন, স্যার, গেটের বাইরে গিয়া সালেহ কাকা বা নাজমুলের ভাইয়ের দোকান থিকা এক কেজি পুলাওয়ের চাউল, ডাউল, তৈল আর এক হালি আন্ডা লইয়া আইলেই গরিবের হাউস পুরা হয়।’ মোকামের কনফিউশন মনে হয় না টিকটিকিকে স্পর্শ করেছে। সে তার মনোবাঞ্ছা সরল-সোজাভাবে উপস্থাপন করে মোকামের সামনে।
মোকামের চোখ সরু হয়ে ওঠে। এমন এক প্রাণী, যার মানুষের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচিত থাকার কথা নয় কোনোভাবেই, সে-ই কিনা বৃষ্টিভেজা রাতের পরিবেশের সঙ্গে মানুষের খানাখাদ্যসংক্রান্ত সহজাত রুচিকে একদম নিখুঁতভাবে মিলিয়ে রাতের খাবারের আরজি পেশ করছে! কিন্তু মোকামের পক্ষে বেশিক্ষণ অবাক হয়ে থাকা সম্ভব হয় না, কারণ, সে টের পায় যে সে নিজেই বেশি করে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ভাজা গরম-গরম ডিমের সঙ্গে ধোঁয়াওঠা ল্যাটকা খিচুড়ি খাওয়ার জন্য ভেতরে-ভেতরে মারা যাচ্ছে। তার জিহ্বা, মুখগহ্বর লালায় টইটম্বুর হয়ে আছে। এ রকম সাধারণ একটা খাবার খাওয়ার জন্য শেষ কবে তার মনের ভেতর এত তীব্র বাসনা জেগেছিল, সে মনে করতে পারে না। বাসনাটা কি টিকটিকির, নাকি তার নিজের বাসনাই গিয়ে চেপেছে প্রাণীটার ওপর? এদিকে আবদার করামাত্রই সায় দিলে জন্তুটা মাথায় চড়ে বসতে পারে। মোকামের এখন কী করা উচিত?
‘বাইর হইয়া যান, স্যার,’ টিকটিকির কথায় মোকামের সংবিৎ ফেরে। ‘কিছুক্ষণ পর ব্যাবাকটি দোকানে শাটার ফেলায়া দিব। বারিষের রাত। সবারই ঘরে গরম ভাত আর ডবকা বিবি।’
মোকাম ভ্রু কুঁচকে তাকায় ফেচফেচ শব্দ তুলে হাসতে থাকা টিকটিকির দিকে। চলবে
রিপোর্টারের নাম 

























