ঢাকা ০২:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: সেনাপ্রধান মইনের সিদ্ধান্তহীনতা, নাকি পরিকল্পিত নীরবতা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৩২ বার পড়া হয়েছে

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক ঘটনা। এই হত্যাযজ্ঞে ৭৪ জন সেনা কর্মকর্তা নির্মমভাবে প্রাণ হারান, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ভয়াবহ দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রাক্তন সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেছে।

কমিশনের ভাষ্যমতে, হত্যা শুরুর পর সকাল ৯টা থেকেই পরিস্থিতির ভয়াবহতার তথ্য সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের কাছে পৌঁছালেও তিনি তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান শুরু করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সময়ক্ষেপণ করেন এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেননি। জেনারেল মঈনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল, তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান বাধাগ্রস্ত করা, অপারেশনাল কমান্ড সেন্টার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, ‘ভারতীয় সেনা হস্তক্ষেপের অদ্ভুত যুক্তি’ উত্থাপন করা এবং নিহত অফিসারদের মৃত্যুসংবাদ জেনেও নিষ্ক্রিয় থাকা। কমিশন তার কর্মকাণ্ডকে ‘ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সমর্থন, সত্য গোপন, সেনাবাহিনীর মনোবলে আঘাত এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ সৃষ্টি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল জহির ও এয়ার মার্শাল জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা সংকট মুহূর্তে সামরিক অভিযান শুরুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপ্রধানকে রাজি করানোর চেষ্টা করেননি এবং বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার আক্রান্ত হলেও প্রত্যাঘাতে উদ্যোগ নেননি। কমিশন এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি দায়িত্বহীনতা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

লে. জেনারেল সিনা ইবনে জামালী সেনাপ্রধানের অনুপস্থিতিতে অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও ৪৬ স্বতন্ত্র ব্রিগেডকে সঠিক নির্দেশনা দেননি এবং সামরিক অভিযান চালাতে উদ্যোগ নেননি। জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে বিডিআরে অবস্থানকালে স্ত্রীর মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, তাপস হত্যা মামলায় ফাঁসানো সেনা অফিসারদের অনিয়ম করে হস্তান্তর এবং সেনাপ্রধান থাকাকালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অদক্ষ অফিসারদের পদোন্নতি দিয়ে ‘সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা’র অভিযোগ আনা হয়েছে।

লে. জেনারেল মইনুল ইসলাম ডিজিএফআইয়ের তত্ত্বাবধানে আটক বিডিআর সদস্যদের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় অফিসারদের ‘ফাঁসানো’র জন্য অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, পরিবারের সাথে যোগাযোগ ও আইনি সহায়তা বন্ধ রাখা এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা। লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঘটনাস্থলে গিয়ে বিদ্রোহ দমনের বদলে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে দেখা করা, সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা।

মাঠপর্যায়ে ষড়যন্ত্রে জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে লে. কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, হত্যাকারীদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ যোগদান। ব্রিগেডিয়ার ইমামুল হুদা, মাহমুদ হোসেন, মাহবুব সারোয়ারের বিরুদ্ধে তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় সেনা অফিসারদের নির্যাতন, সাদা কাগজে সই নেয়া, আলামত বিকৃতকরণ এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এসেছে।

ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব লে. জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, বিদ্রোহের আগাম তথ্য না পাওয়া, ডিজি বিডিআরের মৃত্যুসংবাদ গোপন করা, পলায়নরত হত্যাকারীদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেওয়া, সেনা অভিযানে বাধা সৃষ্টি, এবং তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় সেনা অফিসারদের ফাঁসানো। কমিশন এই ব্যর্থতাকে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট, বিডিআর হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিদ্রোহ ছিল না, বরং ছিল সামরিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জটিল সমন্বয়। নির্দেশহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আনুগত্যের দ্বিধা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সমন্বয়ে ৭৪ জন কর্মকর্তা প্রাণ হারান, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর বহুস্তরীয় ব্যর্থতার ফল। রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষা একটাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আবার ঘটতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মিয়ানমারে সু চির সাবেক আসনে জয়ী জান্তা সমর্থিত দল ইউএসডিপি

পিলখানা হত্যাকাণ্ড: সেনাপ্রধান মইনের সিদ্ধান্তহীনতা, নাকি পরিকল্পিত নীরবতা?

আপডেট সময় : ১২:১৬:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক ঘটনা। এই হত্যাযজ্ঞে ৭৪ জন সেনা কর্মকর্তা নির্মমভাবে প্রাণ হারান, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ভয়াবহ দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রাক্তন সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করেছে।

কমিশনের ভাষ্যমতে, হত্যা শুরুর পর সকাল ৯টা থেকেই পরিস্থিতির ভয়াবহতার তথ্য সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদের কাছে পৌঁছালেও তিনি তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান শুরু করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সময়ক্ষেপণ করেন এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেননি। জেনারেল মঈনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল, তাৎক্ষণিক সেনা অভিযান বাধাগ্রস্ত করা, অপারেশনাল কমান্ড সেন্টার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা, ‘ভারতীয় সেনা হস্তক্ষেপের অদ্ভুত যুক্তি’ উত্থাপন করা এবং নিহত অফিসারদের মৃত্যুসংবাদ জেনেও নিষ্ক্রিয় থাকা। কমিশন তার কর্মকাণ্ডকে ‘ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সমর্থন, সত্য গোপন, সেনাবাহিনীর মনোবলে আঘাত এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ সৃষ্টি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল জহির ও এয়ার মার্শাল জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা সংকট মুহূর্তে সামরিক অভিযান শুরুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপ্রধানকে রাজি করানোর চেষ্টা করেননি এবং বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার আক্রান্ত হলেও প্রত্যাঘাতে উদ্যোগ নেননি। কমিশন এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি দায়িত্বহীনতা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

লে. জেনারেল সিনা ইবনে জামালী সেনাপ্রধানের অনুপস্থিতিতে অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও ৪৬ স্বতন্ত্র ব্রিগেডকে সঠিক নির্দেশনা দেননি এবং সামরিক অভিযান চালাতে উদ্যোগ নেননি। জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে বিডিআরে অবস্থানকালে স্ত্রীর মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, তাপস হত্যা মামলায় ফাঁসানো সেনা অফিসারদের অনিয়ম করে হস্তান্তর এবং সেনাপ্রধান থাকাকালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অদক্ষ অফিসারদের পদোন্নতি দিয়ে ‘সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা’র অভিযোগ আনা হয়েছে।

লে. জেনারেল মইনুল ইসলাম ডিজিএফআইয়ের তত্ত্বাবধানে আটক বিডিআর সদস্যদের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় অফিসারদের ‘ফাঁসানো’র জন্য অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, পরিবারের সাথে যোগাযোগ ও আইনি সহায়তা বন্ধ রাখা এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা। লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঘটনাস্থলে গিয়ে বিদ্রোহ দমনের বদলে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে দেখা করা, সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা।

মাঠপর্যায়ে ষড়যন্ত্রে জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে লে. কর্নেল শামসুল আলম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, হত্যাকারীদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া এবং ষড়যন্ত্রে প্রত্যক্ষ যোগদান। ব্রিগেডিয়ার ইমামুল হুদা, মাহমুদ হোসেন, মাহবুব সারোয়ারের বিরুদ্ধে তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় সেনা অফিসারদের নির্যাতন, সাদা কাগজে সই নেয়া, আলামত বিকৃতকরণ এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এসেছে।

ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্ব লে. জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, বিদ্রোহের আগাম তথ্য না পাওয়া, ডিজি বিডিআরের মৃত্যুসংবাদ গোপন করা, পলায়নরত হত্যাকারীদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেওয়া, সেনা অভিযানে বাধা সৃষ্টি, এবং তাপস হত্যা চেষ্টা মামলায় সেনা অফিসারদের ফাঁসানো। কমিশন এই ব্যর্থতাকে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট, বিডিআর হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিদ্রোহ ছিল না, বরং ছিল সামরিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জটিল সমন্বয়। নির্দেশহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আনুগত্যের দ্বিধা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার সমন্বয়ে ৭৪ জন কর্মকর্তা প্রাণ হারান, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর বহুস্তরীয় ব্যর্থতার ফল। রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষা একটাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আবার ঘটতে পারে।