ঢাকা ০৩:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

কাতার সংকটে জ্বালানি খাতে বড় ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ: ভর্তুকি দ্বিগুণ হওয়ার শঙ্কা

ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির এলএনজি অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির সিংহভাগই কাতারনির্ভর হওয়ায় এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। ইতোমধ্যে কাতার বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সাতটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে, যার ফলে বিকল্প উৎস থেকে অত্যন্ত চড়া দামে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়েছে। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই পরিস্থিতির কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে সরকারকে এখন বিশাল অঙ্কের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। আর যদি ব্যয় কমাতে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা শিল্প খাতের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হামলার পর কাতার জানিয়েছে যে, এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ এই রাস লাফান হাব থেকে আসে, ফলে এর প্রভাব চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোতেও পড়ছে। কাতার এনার্জির তথ্যমতে, ১৪টি এলএনজি ট্রেনের মধ্যে দুটি এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে সেখানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম। ইসরায়েল জানিয়েছে যে সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে এবং ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ চেয়েছে, যার মধ্যে আইএমএফ থেকে ১.৩ বিলিয়ন এবং এডিবি থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে, তার ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই আসে কাতার থেকে। ২০১৭ ও ২০২৩ সালে পেট্রোবাংলার সঙ্গে কাতারের করা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় বছরে প্রায় ৩.৬ থেকে ৪.৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও ওমানের সঙ্গেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে এবং স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়, কিন্তু কাতারের মতো বড় হাব বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটেও এখন আর কম দামে গ্যাস পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মার্চের শুরুতে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১৫ থেকে ১৮ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ৩০ থেকে ৩৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

কাতার এনার্জি ইতোমধ্যে ‘ফোর্স মেজেউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে, যার ফলে তারা এলএনজি সরবরাহ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম জানিয়েছেন যে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৫-৬ মাস সময় লাগতে পারে এবং ভর্তুকি বাড়াতে না চাইলে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন যে, এপ্রিলের সেচ ও গ্রীষ্মের চাহিদা মেটাতে এখন অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রযুক্তির বিস্ময় আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র: যেভাবে আকাশপথে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করে এই মারণাস্ত্র

কাতার সংকটে জ্বালানি খাতে বড় ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ: ভর্তুকি দ্বিগুণ হওয়ার শঙ্কা

আপডেট সময় : ১০:৪১:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির এলএনজি অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির সিংহভাগই কাতারনির্ভর হওয়ায় এই বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতে। ইতোমধ্যে কাতার বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত সাতটি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে, যার ফলে বিকল্প উৎস থেকে অত্যন্ত চড়া দামে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়েছে। পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই পরিস্থিতির কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে সরকারকে এখন বিশাল অঙ্কের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। আর যদি ব্যয় কমাতে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে তীব্র লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা শিল্প খাতের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হামলার পর কাতার জানিয়েছে যে, এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগবে এবং পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ এই রাস লাফান হাব থেকে আসে, ফলে এর প্রভাব চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোতেও পড়ছে। কাতার এনার্জির তথ্যমতে, ১৪টি এলএনজি ট্রেনের মধ্যে দুটি এবং একটি গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে সেখানে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা খুবই কম। ইসরায়েল জানিয়েছে যে সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে এবং ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকার আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ চেয়েছে, যার মধ্যে আইএমএফ থেকে ১.৩ বিলিয়ন এবং এডিবি থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে, তার ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই আসে কাতার থেকে। ২০১৭ ও ২০২৩ সালে পেট্রোবাংলার সঙ্গে কাতারের করা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় বছরে প্রায় ৩.৬ থেকে ৪.৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও ওমানের সঙ্গেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি রয়েছে এবং স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হয়, কিন্তু কাতারের মতো বড় হাব বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটেও এখন আর কম দামে গ্যাস পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মার্চের শুরুতে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১৫ থেকে ১৮ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ৩০ থেকে ৩৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

কাতার এনার্জি ইতোমধ্যে ‘ফোর্স মেজেউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে, যার ফলে তারা এলএনজি সরবরাহ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম জানিয়েছেন যে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৫-৬ মাস সময় লাগতে পারে এবং ভর্তুকি বাড়াতে না চাইলে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প থাকবে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন যে, এপ্রিলের সেচ ও গ্রীষ্মের চাহিদা মেটাতে এখন অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।