ঢাকা ০৮:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকট ও ঈদযাত্রা: পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি

আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে রাজধানীসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও পাম্পগুলোতে নজিরবিহীন ভিড় সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনে দাঁড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র সামান্য কয়েক লিটার তেল। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনের ঈদযাত্রায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী ভোগান্তির চরম আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর আসাদগেট, জাহাঙ্গীর গেট ও তেজগাঁও এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের জন্য ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং বাসের সারি মূল সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অনেক চালক সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ডিজেল বা অকটেন পাচ্ছেন না। কাভার্ড ভ্যান চালক ইসমাইল হোসেনের মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্প থেকে মাত্র ১০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে দূরপাল্লার কোনো ট্রিপ চালানো অসম্ভব। অনেক পাম্প আবার কিছুক্ষণ তেল বিক্রি করে সরবরাহ নেই বলে গেট বন্ধ করে দিচ্ছে, ফলে অন্য পাম্পগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ; সেখানে নিয়মিত গ্রাহক ছাড়া সাধারণ চালকদের তেল দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ফিলিং স্টেশনগুলো।

সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৬ মার্চ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। একইভাবে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের জন্যও ২০০ থেকে ২২০ লিটারের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই রেশনিং ব্যবস্থার কারণে চালকদের বারবার পাম্পে আসতে হচ্ছে, যা বিশৃঙ্খলাকে আরও উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, অনিয়ম ও মজুদদারি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

জ্বালানির এই অনিশ্চয়তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে ঈদযাত্রার ওপর। বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হলেও তেলের সংকটে অনেক বাস অপারেটর নির্দিষ্ট ট্রিপ বাতিল করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। আইকনিক এক্সপ্রেসের মতো কিছু এসি স্লিপার বাস অপারেটর ইতোমধ্যে যাত্রীদের সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, ঈদের সময় যখন যাত্রী নামিয়ে দিয়ে বাসগুলোকে দ্রুত ফিরে আসতে হয়, তখন পাম্পে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে শিডিউল ঠিক রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। যদি রেশনিং ব্যবস্থা বজায় থাকে, তবে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রী টানার চেয়ে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দেবে, যা ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

পাম্প মালিকদের সংগঠনগুলো এই কৃত্রিম সংকটের জন্য সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কে তেল মজুদের প্রবণতাকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, দেশে প্রকৃত অর্থে তেলের ঘাটতি না থাকলেও গুজবের কারণে হঠাৎ চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাসের বাণী শোনানো হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন যে, ১৫ মার্চ থেকে গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং তেলের দাম বাড়ানো হবে না। মন্ত্রী আশ্বস্ত করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাধারণ মানুষ এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এখন তাকিয়ে আছেন ১৫ মার্চের দিকে, কারণ তেলের জোগান স্বাভাবিক না হলে এবারের ঈদযাত্রা মাটি হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পহেলা বৈশাখে মেট্রোরেলের শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকছে

জ্বালানি সংকট ও ঈদযাত্রা: পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তি

আপডেট সময় : ০৯:৩০:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে রাজধানীসহ সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও পাম্পগুলোতে নজিরবিহীন ভিড় সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় কয়েক দিন ধরেই রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনে দাঁড়িয়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র সামান্য কয়েক লিটার তেল। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনের ঈদযাত্রায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী ভোগান্তির চরম আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর আসাদগেট, জাহাঙ্গীর গেট ও তেজগাঁও এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের জন্য ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান এবং বাসের সারি মূল সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অনেক চালক সারা রাত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ডিজেল বা অকটেন পাচ্ছেন না। কাভার্ড ভ্যান চালক ইসমাইল হোসেনের মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর পাম্প থেকে মাত্র ১০ লিটার তেল দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে দূরপাল্লার কোনো ট্রিপ চালানো অসম্ভব। অনেক পাম্প আবার কিছুক্ষণ তেল বিক্রি করে সরবরাহ নেই বলে গেট বন্ধ করে দিচ্ছে, ফলে অন্য পাম্পগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ; সেখানে নিয়মিত গ্রাহক ছাড়া সাধারণ চালকদের তেল দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ফিলিং স্টেশনগুলো।

সরকার পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৬ মার্চ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। একইভাবে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের জন্যও ২০০ থেকে ২২০ লিটারের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই রেশনিং ব্যবস্থার কারণে চালকদের বারবার পাম্পে আসতে হচ্ছে, যা বিশৃঙ্খলাকে আরও উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, অনিয়ম ও মজুদদারি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

জ্বালানির এই অনিশ্চয়তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে ঈদযাত্রার ওপর। বাসের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হলেও তেলের সংকটে অনেক বাস অপারেটর নির্দিষ্ট ট্রিপ বাতিল করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। আইকনিক এক্সপ্রেসের মতো কিছু এসি স্লিপার বাস অপারেটর ইতোমধ্যে যাত্রীদের সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, ঈদের সময় যখন যাত্রী নামিয়ে দিয়ে বাসগুলোকে দ্রুত ফিরে আসতে হয়, তখন পাম্পে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে শিডিউল ঠিক রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। যদি রেশনিং ব্যবস্থা বজায় থাকে, তবে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রী টানার চেয়ে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দেবে, যা ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

পাম্প মালিকদের সংগঠনগুলো এই কৃত্রিম সংকটের জন্য সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কে তেল মজুদের প্রবণতাকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, দেশে প্রকৃত অর্থে তেলের ঘাটতি না থাকলেও গুজবের কারণে হঠাৎ চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাসের বাণী শোনানো হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন যে, ১৫ মার্চ থেকে গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে এবং তেলের দাম বাড়ানো হবে না। মন্ত্রী আশ্বস্ত করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাধারণ মানুষ এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এখন তাকিয়ে আছেন ১৫ মার্চের দিকে, কারণ তেলের জোগান স্বাভাবিক না হলে এবারের ঈদযাত্রা মাটি হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।