বিদেশি পণ্যের ওপর নতুন করে চড়া আমদানি শুল্ক আরোপের লক্ষ্যে এক বিশাল তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই তদন্তের তালিকায় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশের রফতানি বাণিজ্যে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর) গত বুধবার এক ঘোষণায় জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ৩০১’ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা, সরকারি নীতি এবং বাণিজ্যিক আচরণ পর্যালোচনার জন্য এই বিশেষ তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
এই তদন্তের আওতায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের মোট ১৭টি দেশ ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিগুলোও রয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্প খাত ও কর্মসংস্থান রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। মূলত বিদেশি দেশগুলোতে অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা, সরকারি ভর্তুকি, শ্রমিকদের মজুরি দমন এবং বাজার বিকৃতকারী কোনো নীতি মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে কি না—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। একই সাথে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও পৃথক তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন।
বিজিএমইএ-র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ: তদন্তের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসাকে ‘অস্বস্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তবে তিনি এখনই বড় কোনো ঝুঁকির আশঙ্কা দেখছেন না। গত বৃহস্পতিবার এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্যের জন্য বাংলাদেশ একটি বড় উৎপাদনকারী হলেও মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (IPR) সংক্রান্ত জটিলতা এখানে খুবই সীমিত। শ্রম অধিকারের যে সব পুরনো সমস্যা ছিল, তারও অধিকাংশ সমাধান হয়ে গেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ রফতানি খাতে যে সামান্য ভর্তুকি দেয়, তা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলার মতো নয়। তবে যেহেতু নাম এসেছে, তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এখনই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আদালতের রায় ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল: যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক শুল্ক তদন্তের পেছনে কাজ করছে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক রায়ে আদালত জানায়, প্রেসিডেন্ট এককভাবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট’ (IEEPA) ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারেন না; এই ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের। আদালতের এই রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আমল থেকে চলা অনেক শুল্ক ব্যবস্থা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে মার্কিন প্রশাসন এখন ‘সেকশন ৩০১’-এর মতো বিকল্প আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নতুন করে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার দুই স্তরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী আমদানির ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত অস্থায়ী শুল্ক কার্যকর করা হয়েছে, যার মেয়াদ জুলাই মাসের শেষে শেষ হওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদে এই তদন্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দেশ বা খাতভিত্তিক ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রশাসন।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কতটুকু? বাংলাদেশি রফতানিকারকদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এই বাজারে ৫ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা মোট রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ। বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, যদি দ্রুত কোনো দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা বা ট্রেড ডিল কার্যকর না হয়, তবে এই ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় হারে স্থায়ী শুল্কে রূপ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক উৎপাদনের মতো কৌশলগত সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে এই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই নতুন শুল্ক উত্তেজনা বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রিপোর্টারের নাম 
























