ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সূচনা লগ্নেই এক অভাবনীয় ও সুপরিকল্পিত অভিযান চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় প্রায় চার ডজন নেতাকে নিকেশ করা হয়েছে। ইসরাইলের তৈরি অত্যাধুনিক ‘ব্লু স্প্যারো’ নামক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এই ‘নিখুঁত’ হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করা হয়। এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশ থেকে উৎক্ষেপণের পর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করে মহাশূন্যে পৌঁছে আবার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর দিন শনিবার এই অভিযান পরিচালিত হয়। ইসরাইলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় তাদের সামরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই আকস্মিক হামলার পরিকল্পনা করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইসরাইলি বাহিনী এমন কিছু তথ্য ও ছবি প্রচার করেছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল আইডিএফ কর্মী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সাপ্তাহিক ছুটির জন্য সদর দপ্তর ত্যাগ করছেন। কিন্তু বাস্তবে, তারা ছদ্মবেশ ধারণ করে অত্যন্ত গোপনে পুনরায় দপ্তরে ফিরে যান এবং খামেনির কম্পাউন্ডে হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেন।
মূলত রাতে হামলার পরিকল্পনা থাকলেও, তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের শনিবার সকালের একটি বৈঠকের খবর গোয়েন্দাদের হাতে আসে। এই নতুন তথ্যের ভিত্তিতে হামলার সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। ধারণা করা হতো, খামেনি আত্মরক্ষার জন্য অধিকাংশ রাত ভূগর্ভস্থ বাংকারে কাটাতেন। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
ইসরাইলের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, খামেনির কম্পাউন্ডে নিয়োজিত দেহরক্ষীদের গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিল। পাস্তুর স্ট্রিটে বসানো একটি ক্যামেরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য তেল আবিবে প্রেরণ করা হয়। এর ফলে ইসরাইলি কর্মকর্তারা হামলার জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করতে সক্ষম হন।
ইরানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় এফ-১৫ জেট ও অন্যান্য যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করা হয়। এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর, খামেনির কম্পাউন্ডের কেন্দ্রস্থলকে লক্ষ্য করে বিমানগুলো থেকে ‘ব্লু স্প্যারো’ সহ মোট ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্কাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি, যা পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক ব্যবহার করেছিল। এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মহাকাশ থেকে পৃথিবীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সময় প্রচণ্ড গতি অর্জন করে, যার ফলে সেগুলোকে আকাশে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানে হামলার সময়ও ইসরাইল এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল।
প্রথম দফার হামলার সময় আইডিএফ ও মার্কিন বাহিনী সরাসরি যুক্ত ছিল, যাতে ইরানের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়। একই সঙ্গে, খামেনির কম্পাউন্ড এলাকায় একডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, যাতে খামেনির নিরাপত্তা বাহিনী কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা না পায়। এই হ্যাকিং ও গোয়েন্দা তৎপরতা ছিল খামেনিকে হত্যার জন্য মোসাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও অভিযানেরই অংশ।
এই পরিকল্পিত হামলায় খামেনি ছাড়াও ইরানের ৪০ জনেরও বেশি শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন বলে ইসরাইলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। নিহতদের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অফ স্টাফ ও দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা আব্দুর রহিম মুসাভি, খামেনির কন্যা, নাতি-নাতনি, পুত্রবধূ এবং জামাতাও রয়েছেন। এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে এর ধ্বংসাবশেষ পশ্চিম ইরাকেও খুঁজে পাওয়া গেছে।
রিপোর্টারের নাম 




















