বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা, নিউজিল্যান্ডের পিটার জ্যাকসনকে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানসূচক পাম দ’র প্রদান করা হবে। তার চার দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। আগামী ২০২৬ সালের ১২ মে ফ্রান্সের কান সৈকতে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কিংবদন্তি পরিচালকের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হবে।
কান উৎসব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পিটার জ্যাকসন তার অনন্য শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রযুক্তির সাহসী ব্যবহার এবং হলিউডের বাণিজ্যিক ব্লকবাস্টার ও শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের সফল সংমিশ্রণের মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। এর আগে অ্যাগনেস ভারদা, মার্কো বেল্লছিও, জোডি ফস্টার, মেরিল স্ট্রিপ এবং গত বছর রবার্ট ডি নিরোর মতো বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেছেন।
সম্মাননা প্রাপ্তির খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জ্যাকসন বলেন, “কান উৎসবে সম্মানসূচক পাম দ’র পাওয়া আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সম্মান। কানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং অবিচ্ছেদ্য। ১৯৮৮ সালে আমার প্রথম চলচ্চিত্র ‘ব্যাড টেস্ট’ নিয়ে আমি এই উৎসবের মার্কেটপ্লেসে অংশ নিয়েছিলাম। এরপর ২০০১ সালে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’ ছবির একটি প্রিভিউ সিকোয়েন্স এখানে দেখানো হয়েছিল। কান সব সময়ই সাহসী ও দূরদর্শী সিনেমাকে উদযাপন করে, এমন একটি মঞ্চ থেকে স্বীকৃতি পেয়ে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।”
কানের মঞ্চে মধ্য-পৃথিবীর জাদুর শুরু
২০০১ সালের ১৩ মে, বিশ্বজুড়ে মুক্তির প্রায় সাত মাস আগে, কান উৎসবে সাংবাদিকদের জন্য ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: দ্য ফেলোশিপ অব দ্য রিং’ ছবির ২৬ মিনিটের বিশেষ ফুটেজ প্রদর্শিত হয়। প্রাথমিকভাবে কিছু সংশয় থাকলেও, চলচ্চিত্রটি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং সেখান থেকেই জে. আর. আর. টলকিনের মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘মিডল আর্থ’-এর অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তীতে ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজি বিশ্বজুড়ে ১৭টি অস্কার জিতে নেয়, যার মধ্যে ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং’ একাই ১১টি অস্কার পেয়ে ‘বেন-হার’ এবং ‘টাইটানিক’-এর রেকর্ড স্পর্শ করে। বিশ্বব্যাপী প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার আয় করা এই সিরিজটি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করে। এই ট্রিলজি (২০০১, ২০০২, ২০০৩) নিউজিল্যান্ডে ধারণ করা হয় এবং এর নির্মাণে ছিল দুই বছরের প্রি-প্রোডাকশন, ২৭৪ দিনের শুটিং, তিন বছরের পোস্ট-প্রোডাকশন এবং প্রায় ২০ হাজার এক্সট্রা শিল্পী ও ২৪০০ প্রযুক্তিকর্মীর বিশাল কর্মযজ্ঞ। জ্যাকসনের নিজস্ব ভিএফএক্স স্টুডিওর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
ব্লকবাস্টার থেকে তথ্যচিত্র নির্মাণ
‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির অভাবনীয় সাফল্যের পর, পিটার জ্যাকসন ২০০৫ সালে ‘কিং কং’ নির্মাণ করেন। এরপর তিনি পুনরায় টলকিনের জগতে ফিরে এসে ‘দ্য হবিট’ ট্রিলজি পরিচালনা করেন, যা ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে মুক্তি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ব্যতিক্রমধর্মী তথ্যচিত্র নির্মাণেও মনোযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আর্কাইভ ফুটেজ পুনরুদ্ধার করে তিনি তৈরি করেছেন প্রশংসিত তথ্যচিত্র ‘দে শ্যাল নট গ্রো ওল্ড’ (২০১৮) এবং ব্রিটিশ ব্যান্ড দ্য বিটলস-এর অপ্রকাশিত ফুটেজ নিয়ে নির্মাণ করেছেন আলোচিত মিনি সিরিজ ‘দ্য বিটলস: গেট ব্যাক’।
পিটার জ্যাকসন তার দীর্ঘ চার দশকের চলচ্চিত্র জীবনে প্রযুক্তি, কল্পনা এবং গল্প বলার এক অনন্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন। তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কানের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পাম দ’র তার মুকুটে নতুন পালক যোগ করল।
রিপোর্টারের নাম 

























