ঢাকা ০৭:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার অপরিহার্য: স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি

বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নিম্নহার নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এই মত তুলে ধরেন।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন: অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক এই কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জন্ম নিলেও বা মারা গেলেও তাদের প্রায় অর্ধেকই রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কার্যত রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্য করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধনবিহীন নাগরিকরা শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, মানবপাচার এবং নানা ধরনের বৈষম্যের ঝুঁকিতে থাকেন। একই সাথে, জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে সরকার কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কর্মশালায় বক্তারা জানান, বর্তমান আইনে নিবন্ধনের প্রধান দায়িত্ব পরিবারের ওপর ন্যস্ত, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর এই দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অথচ, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর জন্মই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন ব্যবস্থার অভাবে এই জন্মগুলোর একটি বড় অংশ নিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে বক্তারা বলেন, এই দেশগুলো স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পেরেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অর্জনে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করার পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থা ইউএনএসকাপের শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি এসডিজি ১৬.৯, অর্থাৎ সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র, অর্জন সম্ভব হবে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার যাতে জাতীয় অগ্রাধিকার পায়, সে জন্য নিবন্ধনের বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে।

গত ৩ ও ৪ মার্চ (মঙ্গল ও বুধবার) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভবনে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ায় কর্মরত ৩২ জন সাংবাদিক অংশ নেন। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং কোঅর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান

নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার অপরিহার্য: স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি

আপডেট সময় : ০৫:৩৭:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নিম্নহার নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যমান জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এই মত তুলে ধরেন।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন: অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক এই কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জন্ম নিলেও বা মারা গেলেও তাদের প্রায় অর্ধেকই রাষ্ট্রীয় নথিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কার্যত রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অদৃশ্য করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধনবিহীন নাগরিকরা শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, মানবপাচার এবং নানা ধরনের বৈষম্যের ঝুঁকিতে থাকেন। একই সাথে, জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে সরকার কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কর্মশালায় বক্তারা জানান, বর্তমান আইনে নিবন্ধনের প্রধান দায়িত্ব পরিবারের ওপর ন্যস্ত, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর এই দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অথচ, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর জন্মই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন ব্যবস্থার অভাবে এই জন্মগুলোর একটি বড় অংশ নিবন্ধনের বাইরে থেকে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে বক্তারা বলেন, এই দেশগুলো স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে পেরেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অর্জনে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করার পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থা ইউএনএসকাপের শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি এসডিজি ১৬.৯, অর্থাৎ সবার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র, অর্জন সম্ভব হবে।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কার যাতে জাতীয় অগ্রাধিকার পায়, সে জন্য নিবন্ধনের বহুমুখী প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে।

গত ৩ ও ৪ মার্চ (মঙ্গল ও বুধবার) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভবনে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ায় কর্মরত ৩২ জন সাংবাদিক অংশ নেন। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং কোঅর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন।