ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের মৃত্যুর পরও তেহরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিমান হামলা তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে যখন শীর্ষ নেতারা উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়েও তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হামলাকারীরা। রোববার রাজধানী তেহরানের একাধিক এলাকায় ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলো। তবে ইরান কর্তৃপক্ষ আমেরিকার সঙ্গে যেকোনো আলোচনা থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে। এদিকে, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
গত শনিবার যুদ্ধের শুরুতেই তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হওয়ার পর, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বাকি শীর্ষ নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন যে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করেই তারা এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর কার্যকর আইন অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ পরিষদ নামের একটি ধর্মীয় সংস্থাকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, খামেনির মৃত্যুর পর একটি ‘নতুন নেতৃত্বের’ জন্য পরিষদ কাজ শুরু করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আলজাজিরাকে বলেছেন, এই প্রক্রিয়াটি কয়েক দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া উচিত। তিনি আরও জানান, নতুন নেতৃত্ব না আসা পর্যন্ত তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের সদস্য হিসেবে থাকছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আয়াতুল্লাহ আলি রেজা আরাফি। গার্ডিয়ান কাউন্সিল একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক নজরদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। রোববার প্রথম ভিডিও ভাষণে, পেজেশকিয়ান যুদ্ধের মধ্যেও প্রতিষ্ঠাপন্থি সমর্থকদের মসজিদ এবং শহরের প্রধান রাস্তায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। নতুন পরিষদের জন্য আইনশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সালিশ সংস্থাকে।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর গঠিত ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যা এরপর থেকে একটি বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, এই নেতৃত্ব পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শনিবার খামেনির সঙ্গে নিহত হয়েছেন আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফ মোহাম্মদ পাকপুর। ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তার পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর তাকে এই পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দোরহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের প্রধান আলী শামখানি এবং পুলিশ গোয়েন্দাপ্রধান গোলাম-রেজা রেজাইয়ানও নিহত হয়েছেন।
শীর্ষ নেতাদের হত্যার পর আইআরজিসি কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরায়েল এবং আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করেছে তারা। এদিকে, ইরানের সেনাবাহিনী প্রধান আমির হাতামিও দেশকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, এই অঞ্চলজুড়ে আমেরিকান ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে তাদের যুদ্ধবিমান। পুলিশপ্রধান আহমেদ-রেজা রাদান জানিয়েছেন, জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনী সর্বোচ্চ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। এর আগেও আমেরিকা এবং ইসরায়েল জনগণকে রাজপথে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ করার আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে এই দুই দেশ ক্ষমতাসীনদের উৎখাত করতে পারে।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতা কাঠামোর আরেকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, নিরাপত্তাপ্রধান আলি লারিজানি, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছেন। একই সঙ্গে ইরানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি। আরবি ভাষায় এক্সে করা এক পোস্টে হাতামি লিখেছেন, তেহরান তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। তবে তাদের দেশে থাকা আমেরিকান ঘাঁটিগুলোকে আমেরিকান অঞ্চল বলে মনে করেন তারা। ইংরেজিতে লেখা অন্য একটি পোস্টে তিনি বলেছেন, ‘আমরা তাদের এমন শক্তি দিয়ে আঘাত করব যা এর আগে কখনো অনুভব করেনি তারা।’
আইআরজিসির একজন শীর্ষ কমান্ডার এবং সুপ্রিম ডিফেন্স কাউন্সিলে খামেনির নিযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান আলি আকবর আহমাদিয়ান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, শামখানিসহ তার শীর্ষ সদস্যদের হত্যা করা সত্ত্বেও সংস্থাটি তার কাজ চালিয়ে যাবে। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল জোরদার করতেই এই কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল।
রিপোর্টারের নাম 





















