উজানের দেশগুলোতে একের পর এক বাঁধ নির্মাণের বিরূপ প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের নদ-নদী। বিশেষ করে বগুড়া অঞ্চলে যমুনা নদীর নাব্য সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। শুষ্ক মৌসুম শুরু হতে না হতেই নদীর বুকজুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর, যার ফলে বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ আটটি নৌপথ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নাব্য সংকটের কারণে সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলার অন্তত আটটি রুটে নৌকা চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি সারিয়াকান্দির কালিতলা থেকে মাদারগঞ্জ পর্যন্ত আন্তঃজেলা নৌপথটিও এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। একসময় যে যমুনায় বড় বড় জাহাজ চলত, সেখানে এখন ছোট ডিঙি নৌকা চালানোও দায় হয়ে পড়েছে। ফলে ১৪১টি চরের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা নদীর বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ২২০ কিলোমিটার। ভারত ও চীনের অভ্যন্তরে যমুনার উজানে অন্তত ১৪টি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বাঁধের প্রভাবে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় যমুনার গড় গভীরতা প্রায় সাড়ে ৯ মিটার থাকলেও বর্তমানে তা কমে মাত্র দুই মিটারে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানে গভীরতা এর চেয়েও কম।
নদী পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা এখন বিপন্ন। কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের শোনপচা চরের বাসিন্দা আয়েন উদ্দিন জানান, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন বালুচরে চাষাবাদ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালু আর বর্ষায় থৈ থৈ পানির কারণে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। একই অবস্থা মাঝিদেরও। বালুচরা গ্রামের প্রবীণ মাঝি আব্দুল মতিন আক্ষেপ করে বলেন, “নদীতে পানি না থাকায় বছরের দীর্ঘ সময় বেকার বসে থাকতে হয়। নৌকা চালাতে গিয়ে বারবার ডুবোচরে তলা আটকে যায়। এই বয়সে অন্য কোনো কাজ করারও উপায় নেই।”
উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির জন্য মূলত উজান থেকে আসা পলি ও পানির স্বল্পতাকে দায়ী করছেন। সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস জানান, নদী শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হওয়ায় ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের মতে, যমুনা নদী খনন করা বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানান, যমুনা নদীতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বালু জমা হয়, যা খনন করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। তিনি সতর্ক করে বলেন, উজানের দেশগুলো পানি নিয়ন্ত্রণ করায় বর্ষায় যেমন বন্যা দেখা দেয়, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল ভয়াবহ মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























