ঢাকা ১১:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

এমভি মহারাজ ট্র্যাজেডি: ২১ বছর পরেও চাঁদপুরের আকাশে স্বজন হারানোর আর্তনাদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:১৬:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের নদীপথে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ২১ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালের এই দিনে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে ঢাকার সদরঘাট থেকে মতলবগামী এমভি মহারাজ লঞ্চ নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় ডুবে যায়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে নিমজ্জিত হওয়া সেই লঞ্চে প্রাণ হারান প্রায় দুই শতাধিক মানুষ, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন চাঁদপুরের মতলব অঞ্চলের বাসিন্দা। একুশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ক্ষত আজও শুকায়নি, স্বজন হারানোর বেদনা আজও একই তীব্রতায় বাজে নিহতদের পরিবারে।

২০০৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকার সদরঘাট থেকে মতলবের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এমভি মহারাজ। পথিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি উল্টে যায় এবং দ্রুত তলিয়ে যায় মেঘনার অতল গভীরে। লঞ্চটিতে মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার যাত্রী ছাড়াও চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ছিলেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় প্রায় দু’শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অকালে প্রাণ হারান, যা বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে।

সেই ভয়াবহ দিনে যারা চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী ও তার কনিষ্ঠ কন্যা, কচি-কাঁচা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিলাত জাহান অর্থি। আরও ছিলেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই মাস্টার, আইসিডিডিআরবির ডা. মো. মাসুম, প্রকৌশলী ফারুক দেওয়ান, সার ব্যবসায়ী ইয়াসিন মৃধা এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ফারুক দেওয়ানসহ তার পরিবার। মফিজুল ইসলাম, ছোট খোকন, বড় খোকন, শাহআলম, টিপু শিকদার, আবু হানিফ, ইয়াছিন আরাফাত, বাদল হোসেন, টিপু মুন্সি, সুমন মিয়ার মতো অসংখ্য নাম আজও স্বজনদের হৃদয়ে গভীর শোকের অনল জ্বালিয়ে রেখেছে।

সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের সাক্ষী মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়ার বাসিন্দা তোফায়েল পাটোয়ারী আজও শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসা অলৌকিক। কেবল আল্লাহর রহমতেই বেঁচে আছি। সেই দৃশ্যের বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই।’ দুর্ঘটনায় যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো ছবি তুলে বেওয়ারিশ হিসেবে মতলব দক্ষিণের ঢাকিরগাঁও রিয়াজুল জান্নাত কবরস্থানে দাফন করা হয়। আজও দূরদূরান্ত থেকে স্বজনরা এসে সেই কবর জিয়ারত করে প্রিয়জনদের স্মরণ করেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

প্রতিবছরের মতো এবারও ১৯ ফেব্রুয়ারি এলে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়রা মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও শোকসভার আয়োজন করে। তারা প্রিয়জনদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি নদীপথে নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। তাদের আকুতি, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্বজন হারানোর বেদনা বহন করতে না হয়।

মতলববাসীর কাছে ১৯ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি এক জীবন্ত স্মৃতি, এক অবিস্মরণীয় শোকগাথা। সময়ের পরিক্রমায় এই বেদনাবিধুর স্মৃতি মুছে যায়নি, বরং প্রতি বছর ফিরে এসে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় একুশ বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা, যা আজও তাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

এমভি মহারাজ ট্র্যাজেডি: ২১ বছর পরেও চাঁদপুরের আকাশে স্বজন হারানোর আর্তনাদ

আপডেট সময় : ০২:১৬:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের নদীপথে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ২১ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৫ সালের এই দিনে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে ঢাকার সদরঘাট থেকে মতলবগামী এমভি মহারাজ লঞ্চ নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় ডুবে যায়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে নিমজ্জিত হওয়া সেই লঞ্চে প্রাণ হারান প্রায় দুই শতাধিক মানুষ, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন চাঁদপুরের মতলব অঞ্চলের বাসিন্দা। একুশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ক্ষত আজও শুকায়নি, স্বজন হারানোর বেদনা আজও একই তীব্রতায় বাজে নিহতদের পরিবারে।

২০০৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকার সদরঘাট থেকে মতলবের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল এমভি মহারাজ। পথিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চটি উল্টে যায় এবং দ্রুত তলিয়ে যায় মেঘনার অতল গভীরে। লঞ্চটিতে মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার যাত্রী ছাড়াও চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ছিলেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় প্রায় দু’শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষ অকালে প্রাণ হারান, যা বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে।

সেই ভয়াবহ দিনে যারা চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী ও তার কনিষ্ঠ কন্যা, কচি-কাঁচা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিলাত জাহান অর্থি। আরও ছিলেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই মাস্টার, আইসিডিডিআরবির ডা. মো. মাসুম, প্রকৌশলী ফারুক দেওয়ান, সার ব্যবসায়ী ইয়াসিন মৃধা এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ফারুক দেওয়ানসহ তার পরিবার। মফিজুল ইসলাম, ছোট খোকন, বড় খোকন, শাহআলম, টিপু শিকদার, আবু হানিফ, ইয়াছিন আরাফাত, বাদল হোসেন, টিপু মুন্সি, সুমন মিয়ার মতো অসংখ্য নাম আজও স্বজনদের হৃদয়ে গভীর শোকের অনল জ্বালিয়ে রেখেছে।

সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের সাক্ষী মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়ার বাসিন্দা তোফায়েল পাটোয়ারী আজও শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসা অলৌকিক। কেবল আল্লাহর রহমতেই বেঁচে আছি। সেই দৃশ্যের বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই।’ দুর্ঘটনায় যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো ছবি তুলে বেওয়ারিশ হিসেবে মতলব দক্ষিণের ঢাকিরগাঁও রিয়াজুল জান্নাত কবরস্থানে দাফন করা হয়। আজও দূরদূরান্ত থেকে স্বজনরা এসে সেই কবর জিয়ারত করে প্রিয়জনদের স্মরণ করেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

প্রতিবছরের মতো এবারও ১৯ ফেব্রুয়ারি এলে নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়রা মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও শোকসভার আয়োজন করে। তারা প্রিয়জনদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি নদীপথে নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। তাদের আকুতি, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্বজন হারানোর বেদনা বহন করতে না হয়।

মতলববাসীর কাছে ১৯ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি এক জীবন্ত স্মৃতি, এক অবিস্মরণীয় শোকগাথা। সময়ের পরিক্রমায় এই বেদনাবিধুর স্মৃতি মুছে যায়নি, বরং প্রতি বছর ফিরে এসে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় একুশ বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা, যা আজও তাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।