ঢাকা ০৬:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

সীতাকুণ্ডে সমুদ্রের বালু দিয়ে কৃষিজমি ভরাটের মহোৎসব: হুমকির মুখে উপকূলীয় পরিবেশ ও কৃষি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৭:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিল্পকারখানা স্থাপনের অজুহাতে ফসলি জমি ধ্বংসের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাগর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শত শত একর আবাদি জমি ভরাট করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে বিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে এই কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় কয়েকশ একর ফসলি জমি স্কেভেটর দিয়ে কেটে বিরানভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্র থেকে পাইপের মাধ্যমে বালু তুলে এসব জমি ভরাট করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রস্তুতি চলছে। এর আগে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই বালু ভরাটের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এমনকি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এবং মানববন্ধন করে তারা এই অপতৎপরতা রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বর্তমানে পুনরায় ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তাদের ভাড়াটে লোকজন এই ভরাট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কৃষিজমি রক্ষায় এলাকাবাসী বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর মিলছে না। এ বিষয়ে অভিযোগের তীর যে শিল্পপতির দিকে, তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট হোসাইন আশরাফ জানান, পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় একদিকে কৃষিজমি কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রের বালু দিয়ে জমি ভরাট করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই এলাকায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। এছাড়া ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের চাপে অনেক কৃষক নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবিকাকে সংকটে ফেলছে।

একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকায়। সেখানে ‘অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একশ একর আবাদি জমি ভরাট শুরু করেছে। এতে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকশ পরিবার জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জামে মসজিদও এই ভরাট কার্যক্রমের ফলে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

এলাকাবাসীর পক্ষে সাবেক ইউপি সদস্য আবুল মুনসুর জানান, অবৈধ বালু ভরাট ও জমি দখলের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজ বন্ধ রাখার নোটিশ দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে কেউ হয়তো এ ধরনের কাজ করে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সীতাকুণ্ডের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ ও পরিবেশবাদীদের দাবি, অবিলম্বে এই অবৈধ ভরাট ও কৃষিজমি ধ্বংসের মহোৎসব বন্ধ করা হোক। অন্যথায় উপকূলীয় কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

সীতাকুণ্ডে সমুদ্রের বালু দিয়ে কৃষিজমি ভরাটের মহোৎসব: হুমকির মুখে উপকূলীয় পরিবেশ ও কৃষি

আপডেট সময় : ০৬:১৭:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিল্পকারখানা স্থাপনের অজুহাতে ফসলি জমি ধ্বংসের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সাগর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে শত শত একর আবাদি জমি ভরাট করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে বিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে এই কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় কয়েকশ একর ফসলি জমি স্কেভেটর দিয়ে কেটে বিরানভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদ্র থেকে পাইপের মাধ্যমে বালু তুলে এসব জমি ভরাট করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার প্রস্তুতি চলছে। এর আগে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই বালু ভরাটের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এমনকি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে এবং মানববন্ধন করে তারা এই অপতৎপরতা রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বর্তমানে পুনরায় ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় তাদের ভাড়াটে লোকজন এই ভরাট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কৃষিজমি রক্ষায় এলাকাবাসী বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর মিলছে না। এ বিষয়ে অভিযোগের তীর যে শিল্পপতির দিকে, তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আইনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট হোসাইন আশরাফ জানান, পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় একদিকে কৃষিজমি কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রের বালু দিয়ে জমি ভরাট করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই এলাকায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। এছাড়া ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটের চাপে অনেক কৃষক নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জীবিকাকে সংকটে ফেলছে।

একই চিত্র দেখা গেছে উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকায়। সেখানে ‘অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একশ একর আবাদি জমি ভরাট শুরু করেছে। এতে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকশ পরিবার জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জামে মসজিদও এই ভরাট কার্যক্রমের ফলে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

এলাকাবাসীর পক্ষে সাবেক ইউপি সদস্য আবুল মুনসুর জানান, অবৈধ বালু ভরাট ও জমি দখলের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজ বন্ধ রাখার নোটিশ দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে কেউ হয়তো এ ধরনের কাজ করে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সীতাকুণ্ডের সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ ও পরিবেশবাদীদের দাবি, অবিলম্বে এই অবৈধ ভরাট ও কৃষিজমি ধ্বংসের মহোৎসব বন্ধ করা হোক। অন্যথায় উপকূলীয় কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।