ঢাকা ০৮:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

নিষিদ্ধ আ.লীগের প্রকাশ্যে কার্যক্রম, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম: ভাস্কর্য পরিষ্কার, ব্যানার টাঙানো, কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১০:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম প্রকাশ্যে শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দলটির নেতাকর্মীরা বন্ধ থাকা কার্যালয়গুলো খুলছেন, দলীয় ব্যানার টাঙাচ্ছেন, জাতীয় পতাকার সঙ্গে দলীয় পতাকা উত্তোলন করছেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দলীয় স্লোগান দিচ্ছেন। এই ধরনের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও বরিশালে এসব ঘটনা জনমনে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং নতুন করে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। চট্টগ্রামের একটি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এর মধ্যে বরিশাল মহানগরীতে গত সোমবার গভীর রাতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নগরীর সোহেল চত্বরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ করে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ‘শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে’ লেখা একটি ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জানা যায়, এই ব্যানারে ‘সৌজন্যে রাজিব হোসেন খান’ লেখা ছিল, যিনি বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তবে, এই কার্যক্রমে কোনো মিছিল বা স্লোগান দেখা যায়নি। আশ্চর্যজনকভাবে, পরদিন মঙ্গলবার সকালে সেই ব্যানারটি আর কার্যালয়ে দেখা যায়নি, যা নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দীন সিকদার জানান, যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই এ বিষয়টি প্রশাসনই দেখবে।

একই সময়ে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আরও বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গত সোমবার বিকেলে নগরীর নিউ মার্কেট মোড় সংলগ্ন দোস্ত বিল্ডিংয়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে দলের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রকাশ্যে আসেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয়, প্রায় একই সময়ে লালদীঘির পাড়ে পুলিশ কমিশনার অফিসের নিচে একটি দেওয়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেন ১৫-২০ জন যুবক। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। প্রকাশ্য দিবালোকে প্রায় আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই কাজ চললেও পুলিশের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

এছাড়াও, একইদিন গভীর রাতে মিরসরাইয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানারসহ মিছিল করে দলটির নেতাকর্মীরা। এই সময় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিটের ছবিযুক্ত ব্যানার প্রদর্শন করে কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, “আমরা এলিটের নির্দেশে কার্যালয়ে এসেছি এবং জয় বাংলা বলে অফিস খুলে দিলাম।” এই সমস্ত ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এনসিপি, ছাত্রশক্তি, যুবশক্তিসহ সাধারণ ছাত্রজনতার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে, গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ শেষে উত্তেজিত ছাত্রজনতা দোস্ত বিল্ডিংয়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নগরীর নিউ মার্কেটস্থ দোস্ত বিল্ডিংয়ের কার্যালয়ে সাইনবোর্ড লাগাচ্ছেন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শওকত উল আনাম এবং ছাত্রলীগ নেতা কাজী সুরুজ। ব্যানারটিতে ‘চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ’ লেখা ছিল। এ সময় তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন নেতাকর্মী ভবনটিতে অবস্থান করলেও ক্যামেরার সামনে আসেননি। এই সকল ঘটনার ভিডিও ভারতের পলাতক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে আসা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। কোতোয়ালি থানা থেকে মাত্র তিনশ গজ দূরে এবং পুলিশ কমিশনার অফিসের নিচে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে প্রকাশ্যে জড়ো হতে পারে, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। আপ বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য সচিব মশিউর রহমান মাহি জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর সারা দেশে আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি এ বিষয়ে নমনীয়তা দেখায় এবং সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন না করে, তবে দেশ অস্থিতিশীল হবে এবং জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সরকারকে মুখোমুখি করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ যতবার ফিরতে চাইবে, ৩৬ জুলাই ততবারই ফিরে আসবে। এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জোবাইরুল আলম মানিক এ ঘটনায় প্রশাসনের দায় সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করে বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন হয়েও তারা কীভাবে অফিস খুলে মিছিল করে। তিনি পুলিশের কোনো তৎপরতা না দেখে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (সহকারী পুলিশ সুপার) আমিনুর রশিদ জানান, এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

নিষিদ্ধ আ.লীগের প্রকাশ্যে কার্যক্রম, উত্তপ্ত চট্টগ্রাম: ভাস্কর্য পরিষ্কার, ব্যানার টাঙানো, কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ

আপডেট সময় : ০৬:১০:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশের বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম প্রকাশ্যে শুরু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দলটির নেতাকর্মীরা বন্ধ থাকা কার্যালয়গুলো খুলছেন, দলীয় ব্যানার টাঙাচ্ছেন, জাতীয় পতাকার সঙ্গে দলীয় পতাকা উত্তোলন করছেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দলীয় স্লোগান দিচ্ছেন। এই ধরনের কর্মকাণ্ড ইতোমধ্যে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও বরিশালে এসব ঘটনা জনমনে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং নতুন করে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। চট্টগ্রামের একটি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এর মধ্যে বরিশাল মহানগরীতে গত সোমবার গভীর রাতে এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। নগরীর সোহেল চত্বরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ করে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ‘শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে’ লেখা একটি ব্যানার টাঙিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। জানা যায়, এই ব্যানারে ‘সৌজন্যে রাজিব হোসেন খান’ লেখা ছিল, যিনি বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তবে, এই কার্যক্রমে কোনো মিছিল বা স্লোগান দেখা যায়নি। আশ্চর্যজনকভাবে, পরদিন মঙ্গলবার সকালে সেই ব্যানারটি আর কার্যালয়ে দেখা যায়নি, যা নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দীন সিকদার জানান, যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই এ বিষয়টি প্রশাসনই দেখবে।

একই সময়ে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আরও বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। গত সোমবার বিকেলে নগরীর নিউ মার্কেট মোড় সংলগ্ন দোস্ত বিল্ডিংয়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে দলের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রকাশ্যে আসেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয়, প্রায় একই সময়ে লালদীঘির পাড়ে পুলিশ কমিশনার অফিসের নিচে একটি দেওয়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করেন ১৫-২০ জন যুবক। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। প্রকাশ্য দিবালোকে প্রায় আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই কাজ চললেও পুলিশের কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।

এছাড়াও, একইদিন গভীর রাতে মিরসরাইয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানারসহ মিছিল করে দলটির নেতাকর্মীরা। এই সময় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিটের ছবিযুক্ত ব্যানার প্রদর্শন করে কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, “আমরা এলিটের নির্দেশে কার্যালয়ে এসেছি এবং জয় বাংলা বলে অফিস খুলে দিলাম।” এই সমস্ত ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এনসিপি, ছাত্রশক্তি, যুবশক্তিসহ সাধারণ ছাত্রজনতার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে, গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ শেষে উত্তেজিত ছাত্রজনতা দোস্ত বিল্ডিংয়ে অবস্থিত আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নগরীর নিউ মার্কেটস্থ দোস্ত বিল্ডিংয়ের কার্যালয়ে সাইনবোর্ড লাগাচ্ছেন উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শওকত উল আনাম এবং ছাত্রলীগ নেতা কাজী সুরুজ। ব্যানারটিতে ‘চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ’ লেখা ছিল। এ সময় তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন নেতাকর্মী ভবনটিতে অবস্থান করলেও ক্যামেরার সামনে আসেননি। এই সকল ঘটনার ভিডিও ভারতের পলাতক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে আসা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। কোতোয়ালি থানা থেকে মাত্র তিনশ গজ দূরে এবং পুলিশ কমিশনার অফিসের নিচে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা কীভাবে প্রকাশ্যে জড়ো হতে পারে, তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। আপ বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগরের সদস্য সচিব মশিউর রহমান মাহি জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর সারা দেশে আওয়ামী লীগ আবার সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি এ বিষয়ে নমনীয়তা দেখায় এবং সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন না করে, তবে দেশ অস্থিতিশীল হবে এবং জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সরকারকে মুখোমুখি করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ যতবার ফিরতে চাইবে, ৩৬ জুলাই ততবারই ফিরে আসবে। এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জোবাইরুল আলম মানিক এ ঘটনায় প্রশাসনের দায় সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করে বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন হয়েও তারা কীভাবে অফিস খুলে মিছিল করে। তিনি পুলিশের কোনো তৎপরতা না দেখে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জনসংযোগ কর্মকর্তা (সহকারী পুলিশ সুপার) আমিনুর রশিদ জানান, এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।