ঢাকা ০৮:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

নেপালের রাজনীতিতে ওলির প্রত্যাবর্তনের লড়াই: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জে কতটা টিকবেন প্রবীণ এই নেতা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৪০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

তীব্র গণআন্দোলন আর রক্তক্ষয়ী সহিংসতার মুখে ক্ষমতা হারানোর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নেপালের রাজনীতিতে আবারও আধিপত্য ফেরানোর লড়াইয়ে নেমেছেন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কে পি শর্মা ওলি। ২০২৫ সালের সেই উত্তাল আন্দোলনের ক্ষত কাটিয়ে আগামী ৫ মার্চের সংসদীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে দেশজুড়ে জোর প্রচারণা শুরু করেছেন ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ। তবে এবারের লড়াইয়ে তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব।

নেপালের চারবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি প্রায় ছয় দশক ধরে দেশটির কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জনের প্রাণহানির পর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তখন বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবন ও সংসদ ভবনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে ওলির নেতৃত্বাধীন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেনিভিস্ট’ (সিপিএন-ইউএমএল) এখন আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে।

সোমবার থেকে শুরু হওয়া আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় ওলি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘দেশ গড়ার শক্তি’ বনাম ‘দেশ ধ্বংসের শক্তি’র লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনে ওলিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই র‍্যাপার কাম রাজনীতিবিদ ওলির খাসতালুকেই তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।

২০২৫ সালের সহিংসতার দায় নিয়ে ওলির ওপর এখনো অনেক বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিশনের সামনে হাজির হয়ে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, নৈরাজ্যবাদী ও অনুপ্রবেশকারী শক্তির কারণে সেই সময় জানমালের ক্ষতি হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, ওলির রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা স্পষ্ট এবং তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তকেই বেশি গুরুত্ব দেন। অবশ্য সমর্থকদের কাছে তিনি এখনো ‘কেপি বা’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ওলির রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি টানা ১৪ বছর জেল খেটেছেন। ১৯৮৭ সালে মুক্তির পর তিনি ধীরে ধীরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০১৫ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৮ এবং ২০২১ সালেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এদিকে, নেপালি কংগ্রেসও তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে; বর্ষীয়ান শের বাহাদুর দেউবার পরিবর্তে তারা ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা নেপালের রাজনীতিতে ওলির ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে তিনি দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও মাঝেমধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন।

আসন্ন ৫ মার্চের নির্বাচন কেবল ওলির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং এটি স্পষ্ট করবে যে নেপালের জনগণ কি অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রাখবে, নাকি তারুণ্যের নতুন জোয়ারে দেশটিতে নতুন কোনো রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে। এখন পুরো হিমালয়কন্যা নেপালের নজর সেই নির্বাচনী ফলাফলের দিকে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, আটক ৪

নেপালের রাজনীতিতে ওলির প্রত্যাবর্তনের লড়াই: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জে কতটা টিকবেন প্রবীণ এই নেতা?

আপডেট সময় : ০৫:৪০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তীব্র গণআন্দোলন আর রক্তক্ষয়ী সহিংসতার মুখে ক্ষমতা হারানোর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নেপালের রাজনীতিতে আবারও আধিপত্য ফেরানোর লড়াইয়ে নেমেছেন প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা কে পি শর্মা ওলি। ২০২৫ সালের সেই উত্তাল আন্দোলনের ক্ষত কাটিয়ে আগামী ৫ মার্চের সংসদীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে দেশজুড়ে জোর প্রচারণা শুরু করেছেন ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ। তবে এবারের লড়াইয়ে তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব।

নেপালের চারবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি প্রায় ছয় দশক ধরে দেশটির কমিউনিস্ট রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সহিংসতায় অন্তত ৭৭ জনের প্রাণহানির পর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তখন বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবন ও সংসদ ভবনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে ওলির নেতৃত্বাধীন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেনিভিস্ট’ (সিপিএন-ইউএমএল) এখন আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে।

সোমবার থেকে শুরু হওয়া আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় ওলি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘দেশ গড়ার শক্তি’ বনাম ‘দেশ ধ্বংসের শক্তি’র লড়াই হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে এবারের নির্বাচনে ওলিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই র‍্যাপার কাম রাজনীতিবিদ ওলির খাসতালুকেই তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।

২০২৫ সালের সহিংসতার দায় নিয়ে ওলির ওপর এখনো অনেক বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিশনের সামনে হাজির হয়ে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি দাবি করেন, নৈরাজ্যবাদী ও অনুপ্রবেশকারী শক্তির কারণে সেই সময় জানমালের ক্ষতি হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, ওলির রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা স্পষ্ট এবং তিনি দলীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তকেই বেশি গুরুত্ব দেন। অবশ্য সমর্থকদের কাছে তিনি এখনো ‘কেপি বা’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ওলির রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ১৯৭৩ সালে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে তিনি টানা ১৪ বছর জেল খেটেছেন। ১৯৮৭ সালে মুক্তির পর তিনি ধীরে ধীরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০১৫ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৮ এবং ২০২১ সালেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় ফিরলেও শেষ রক্ষা হয়নি। এদিকে, নেপালি কংগ্রেসও তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছে; বর্ষীয়ান শের বাহাদুর দেউবার পরিবর্তে তারা ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ভারত ও চীনের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা নেপালের রাজনীতিতে ওলির ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে তিনি দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও মাঝেমধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগকে কাজে লাগিয়েছেন।

আসন্ন ৫ মার্চের নির্বাচন কেবল ওলির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং এটি স্পষ্ট করবে যে নেপালের জনগণ কি অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতৃত্বের ওপরই আস্থা রাখবে, নাকি তারুণ্যের নতুন জোয়ারে দেশটিতে নতুন কোনো রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে। এখন পুরো হিমালয়কন্যা নেপালের নজর সেই নির্বাচনী ফলাফলের দিকে।