ঢাকা ০৮:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

পাকিস্তান-নির্ভরতা ত্যাগের ঘোষণা: আফগান ওষুধ বাজারে অস্থিরতা ও বহুমুখী সংকট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৫:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

ওষুধের মানোন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আমদানিনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে দেশটির ওষুধ বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকট ও আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ রোগীদের নাভিশ্বাস উঠলেও কর্তৃপক্ষ বলছে, জনস্বার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি তালেবান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনায় জানায়, পাকিস্তান থেকে ওষুধ আমদানির দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া বন্ধ করা হচ্ছে। দুই দেশের সীমান্তে সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমদানিকারকদের বিকল্প এবং ‘বৈধ’ উৎস খুঁজে নিতে তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অল্প সময়ে নতুন চুক্তি ও শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য, এর আগে আফগানিস্তানের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ পাকিস্তান থেকে আসত।

রাজধানী কাবুলের ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বাজারে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে ওষুধ আনতে গিয়ে পরিবহন ব্যয় ও সময়—উভয়ই বেড়েছে। ইরান সীমান্ত দিয়ে ওষুধ আমদানিতে পরিবহন খরচ আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেখানে মোট ব্যয়ের মাত্র ৬-৭ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ, তা এখন ২৫-৩০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। আগে পাকিস্তান থেকে মাত্র দুই-তিন দিনে ওষুধ পৌঁছালেও এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

আফগান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, পাকিস্তান থেকে আসা নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ বন্ধ করতেই এই সংস্কার। বর্তমানে ইরান, ভারত, বাংলাদেশ, তুরস্ক, চীন ও বেলারুশের মতো দেশগুলো থেকে ওষুধ আমদানির নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের ওপর বড় ভরসা রাখছে কাবুল। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশটির একটি শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বর্তমানে দৈনিক বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ও সেরাম উৎপাদন করছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে বাজার বিশ্লেষক ও চিকিৎসকরা এই দ্রুত পরিবর্তনের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা, উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রাতারাতি স্বনির্ভর হওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাকিস্তানি ওষুধের প্রতি যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিকল্প ওষুধ খুঁজে বের করা এবং সে অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন করতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাকিস্তান-নির্ভরতা কাটানোর এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল আনবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আপাতত আফগান স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা কাটছে না।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, আটক ৪

পাকিস্তান-নির্ভরতা ত্যাগের ঘোষণা: আফগান ওষুধ বাজারে অস্থিরতা ও বহুমুখী সংকট

আপডেট সময় : ০৫:৩৫:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ওষুধের মানোন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে আমদানিনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তে দেশটির ওষুধ বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকট ও আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ রোগীদের নাভিশ্বাস উঠলেও কর্তৃপক্ষ বলছে, জনস্বার্থেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি তালেবান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এক নির্দেশনায় জানায়, পাকিস্তান থেকে ওষুধ আমদানির দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া বন্ধ করা হচ্ছে। দুই দেশের সীমান্তে সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমদানিকারকদের বিকল্প এবং ‘বৈধ’ উৎস খুঁজে নিতে তিন মাসের সময়সীমা দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অল্প সময়ে নতুন চুক্তি ও শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য, এর আগে আফগানিস্তানের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ পাকিস্তান থেকে আসত।

রাজধানী কাবুলের ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বাজারে অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে ওষুধ আনতে গিয়ে পরিবহন ব্যয় ও সময়—উভয়ই বেড়েছে। ইরান সীমান্ত দিয়ে ওষুধ আমদানিতে পরিবহন খরচ আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেখানে মোট ব্যয়ের মাত্র ৬-৭ শতাংশ ছিল পরিবহন খরচ, তা এখন ২৫-৩০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। আগে পাকিস্তান থেকে মাত্র দুই-তিন দিনে ওষুধ পৌঁছালেও এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।

আফগান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, পাকিস্তান থেকে আসা নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ বন্ধ করতেই এই সংস্কার। বর্তমানে ইরান, ভারত, বাংলাদেশ, তুরস্ক, চীন ও বেলারুশের মতো দেশগুলো থেকে ওষুধ আমদানির নতুন সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের ওপর বড় ভরসা রাখছে কাবুল। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশটির একটি শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বর্তমানে দৈনিক বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক ও সেরাম উৎপাদন করছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে বাজার বিশ্লেষক ও চিকিৎসকরা এই দ্রুত পরিবর্তনের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা, উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রাতারাতি স্বনির্ভর হওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাকিস্তানি ওষুধের প্রতি যে আস্থা তৈরি হয়েছে, তা পরিবর্তন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিকল্প ওষুধ খুঁজে বের করা এবং সে অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন করতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাকিস্তান-নির্ভরতা কাটানোর এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল আনবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আপাতত আফগান স্বাস্থ্য খাতে অস্থিরতা কাটছে না।