ঢাকা ০৫:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

পিৎজার চুলা থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

## পিৎজার চুল্লি থেকে বিশ্বমঞ্চ: এক অভিবাসীর ক্রিকেট গাথা

রোম, ইতালি: মধ্য ইতালির এক প্রত্যন্ত শহরের পিৎজার দোকানে ময়দার লেচি ছুড়ছেন এক তরুণ। দিনের আলোয় তিনি পেশায় পিৎজা প্রস্তুতকারক, কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায় তিনি হয়ে ওঠেন লেগ স্পিনের জাদুকর। ক্রিশান কালুগামাগের জীবন যেন এক দ্বৈত সত্তার প্রতিফলন – একদিকে রুটি-রুজির তাগিদে কর্মব্যস্ততা, অন্যদিকে রক্তে মিশে থাকা ক্রিকেটের স্বপ্ন। এই স্বপ্নই তাকে একদা অভিবাসী জীবন থেকে টেনে এনেছে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে, ইতালির নীল জার্সি গায়ে।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কালুগামাগের অংশগ্রহণ কেবল একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ছিল না, বরং ছিল এক দীর্ঘ ও সংগ্রামময় অভিবাসী জীবনের এক বিরল স্বীকৃতি। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তিনি বহু বছর ধরে লালন করেছেন। যোগ্যতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে তিনি কেঁদেছিলেন, সেই কান্না ছিল আবেগ, গর্ব এবং এক অদ্ভুত প্রত্যাবর্তনের সুর। কারণ, এই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কাতেই কালুগামাগের শৈশব গাঁথা। নেগোম্বোর রোদ ঝলমলে বিকেলে দাদুর পাশে বসে রেডিওতে ক্রিকেট শোনার স্মৃতি আজও তার অমলিন।

২০০৭ সালে, মাত্র ষোল বছর বয়সে, কালুগামাগে তার পরিবারের সাথে কাজের সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি – সবকিছুর ভিড়ে শৈশবের ব্যাট-বল যেন হারিয়ে গিয়েছিল। স্কুলের অনূর্ধ্ব-১৩ ও ১৫ দলে খেলা এই তরুণ হঠাৎই পথহারা হয়ে পড়ে। ইতালিতে তখন ক্রিকেটের তেমন কোনো সুসংহত পরিকাঠামো ছিল না। কিন্তু স্বপ্নের আগুন নিভে যায়নি। টেনিস বলের ক্রিকেট দিয়ে শুরু করে, লুকার ছোট একটি ক্লাবে যোগ দিয়ে এই তরুণ তার স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেন।

২০১৫-১৬ মৌসুমে রোমা ক্রিকেট ক্লাবে সুযোগ পেয়ে তার ক্রিকেট জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখানেই প্রায় এক দশক ধরে তিনি খেলেছেন। মাঝে উচ্চতার কারণে পেসার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, ইনজুরির কারণে তাকে ফিরে আসতে হয় তার আসল পরিচয়ে – লেগ স্পিন। রোমা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাত একনেলিগোডার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, স্পিনই কালুগামাগের নিয়তি। ২০২১ সালে স্পিনে ফিরে আসার পর তিনি যেন নতুন জীবন খুঁজে পান।

শেন ওয়ার্ন, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, রশিদ খান – এই কিংবদন্তিদের ছবি তার ঘরে পোস্টারের মতো শোভা পায়। বিশ্বকাপের আগে এক মাস তিনি কলম্বোতে নেট বোলার হিসেবে কাটিয়েছেন, হাসারাঙ্গার সাথে কথা বলেছেন এবং রশিদের কাছ থেকে শিখেছেন গুগলি। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ইতালির ঐতিহাসিক টি-টোয়েন্টি জয় এবং নেপালের বিপক্ষে দলের আরও একটি ঐতিহাসিক জয়ের পর তিন উইকেট নিয়ে তিনি জানান দিয়েছেন যে, ইতালির নীল জার্সির ভেতরেও এক অদম্য আগুন জ্বলে।

তবে জীবন শুধুই ক্রিকেট নয়। কালুগামাগে তার জীবনকে আগুনের লালচে ছোঁয়ায় রাঙিয়েছেন। সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিনি ‘লা ভিটা পিজ্জারিয়া’য় কাজ করেন। রবিবার ভোরে রোমে অনুশীলনে যান এবং রাতে ফিরে আবার কর্মব্যস্ততায় ডুবে যান। এর মাঝেও তিনি জিম, দৌড় এবং ফিটনেসের সাধনা চালিয়ে যান। ছুটির অভাবে তিনি বহু চাকরি ছেড়েছেন। ক্রিকেট তাকে সংজ্ঞায়িত করে, কিন্তু পেটের দায় তাকে বাস্তবতার মাটিতে ধরে রাখে। তার স্বপ্নগুলো কল্পনার আকাশে উড়লেও, জীবনের বাস্তবতা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়।

ইতালিতে খেলাধুলার প্রসঙ্গে ফুটবলই প্রধান্য পায়। তবুও, ইতালির সাবেক তারকা ফুটবলার ভিয়েরি, পিরলোর শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা জেনোয়া ক্লাবের সমর্থন তাকে প্রেরণা যোগায়। ইন্টার মিলানের সমর্থক কালুগামাগে স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বকাপে উইকেট পেলে তিনি তার প্রিয় দল ইন্টার মিলানের তারকা লাউতারো মার্টিনেজের বিখ্যাত উদযাপন করবেন। ৩৪ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনারের কাছে বিশ্বকাপে ফেরা মানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি একটি প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন। তিনি চান, ভবিষ্যতের ইতালিয়ান ক্রিকেটারদের যেন তার মতো বাধার পাহাড় টপকাতে না হয়। একদিন তিনি কোচ হয়ে এই খেলাটির পাশে থাকতে চান।

পিৎজার চুলার আগুন এবং ক্রিকেটের স্পিন – দুটিই ঘূর্ণায়মান। একটিতে জীবিকা, অন্যটিতে জীবন। ক্রিশান কালুগামাগে প্রমাণ করে চলেছেন যে, স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তা একদিন না একদিন বিশ্বমঞ্চের আলোয় ঠিকই জ্বলে ওঠে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঁশখালীতে শঙ্খ নদীর তীব্র ভাঙন: মুহূর্তেই বিলীন ৪ বসতঘর

পিৎজার চুলা থেকে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে

আপডেট সময় : ০৯:২৮:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## পিৎজার চুল্লি থেকে বিশ্বমঞ্চ: এক অভিবাসীর ক্রিকেট গাথা

রোম, ইতালি: মধ্য ইতালির এক প্রত্যন্ত শহরের পিৎজার দোকানে ময়দার লেচি ছুড়ছেন এক তরুণ। দিনের আলোয় তিনি পেশায় পিৎজা প্রস্তুতকারক, কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায় তিনি হয়ে ওঠেন লেগ স্পিনের জাদুকর। ক্রিশান কালুগামাগের জীবন যেন এক দ্বৈত সত্তার প্রতিফলন – একদিকে রুটি-রুজির তাগিদে কর্মব্যস্ততা, অন্যদিকে রক্তে মিশে থাকা ক্রিকেটের স্বপ্ন। এই স্বপ্নই তাকে একদা অভিবাসী জীবন থেকে টেনে এনেছে ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে, ইতালির নীল জার্সি গায়ে।

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কালুগামাগের অংশগ্রহণ কেবল একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ছিল না, বরং ছিল এক দীর্ঘ ও সংগ্রামময় অভিবাসী জীবনের এক বিরল স্বীকৃতি। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তিনি বহু বছর ধরে লালন করেছেন। যোগ্যতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে তিনি কেঁদেছিলেন, সেই কান্না ছিল আবেগ, গর্ব এবং এক অদ্ভুত প্রত্যাবর্তনের সুর। কারণ, এই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কাতেই কালুগামাগের শৈশব গাঁথা। নেগোম্বোর রোদ ঝলমলে বিকেলে দাদুর পাশে বসে রেডিওতে ক্রিকেট শোনার স্মৃতি আজও তার অমলিন।

২০০৭ সালে, মাত্র ষোল বছর বয়সে, কালুগামাগে তার পরিবারের সাথে কাজের সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি – সবকিছুর ভিড়ে শৈশবের ব্যাট-বল যেন হারিয়ে গিয়েছিল। স্কুলের অনূর্ধ্ব-১৩ ও ১৫ দলে খেলা এই তরুণ হঠাৎই পথহারা হয়ে পড়ে। ইতালিতে তখন ক্রিকেটের তেমন কোনো সুসংহত পরিকাঠামো ছিল না। কিন্তু স্বপ্নের আগুন নিভে যায়নি। টেনিস বলের ক্রিকেট দিয়ে শুরু করে, লুকার ছোট একটি ক্লাবে যোগ দিয়ে এই তরুণ তার স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেন।

২০১৫-১৬ মৌসুমে রোমা ক্রিকেট ক্লাবে সুযোগ পেয়ে তার ক্রিকেট জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সেখানেই প্রায় এক দশক ধরে তিনি খেলেছেন। মাঝে উচ্চতার কারণে পেসার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, ইনজুরির কারণে তাকে ফিরে আসতে হয় তার আসল পরিচয়ে – লেগ স্পিন। রোমা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রভাত একনেলিগোডার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, স্পিনই কালুগামাগের নিয়তি। ২০২১ সালে স্পিনে ফিরে আসার পর তিনি যেন নতুন জীবন খুঁজে পান।

শেন ওয়ার্ন, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, রশিদ খান – এই কিংবদন্তিদের ছবি তার ঘরে পোস্টারের মতো শোভা পায়। বিশ্বকাপের আগে এক মাস তিনি কলম্বোতে নেট বোলার হিসেবে কাটিয়েছেন, হাসারাঙ্গার সাথে কথা বলেছেন এবং রশিদের কাছ থেকে শিখেছেন গুগলি। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ইতালির ঐতিহাসিক টি-টোয়েন্টি জয় এবং নেপালের বিপক্ষে দলের আরও একটি ঐতিহাসিক জয়ের পর তিন উইকেট নিয়ে তিনি জানান দিয়েছেন যে, ইতালির নীল জার্সির ভেতরেও এক অদম্য আগুন জ্বলে।

তবে জীবন শুধুই ক্রিকেট নয়। কালুগামাগে তার জীবনকে আগুনের লালচে ছোঁয়ায় রাঙিয়েছেন। সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিনি ‘লা ভিটা পিজ্জারিয়া’য় কাজ করেন। রবিবার ভোরে রোমে অনুশীলনে যান এবং রাতে ফিরে আবার কর্মব্যস্ততায় ডুবে যান। এর মাঝেও তিনি জিম, দৌড় এবং ফিটনেসের সাধনা চালিয়ে যান। ছুটির অভাবে তিনি বহু চাকরি ছেড়েছেন। ক্রিকেট তাকে সংজ্ঞায়িত করে, কিন্তু পেটের দায় তাকে বাস্তবতার মাটিতে ধরে রাখে। তার স্বপ্নগুলো কল্পনার আকাশে উড়লেও, জীবনের বাস্তবতা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়।

ইতালিতে খেলাধুলার প্রসঙ্গে ফুটবলই প্রধান্য পায়। তবুও, ইতালির সাবেক তারকা ফুটবলার ভিয়েরি, পিরলোর শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা জেনোয়া ক্লাবের সমর্থন তাকে প্রেরণা যোগায়। ইন্টার মিলানের সমর্থক কালুগামাগে স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বকাপে উইকেট পেলে তিনি তার প্রিয় দল ইন্টার মিলানের তারকা লাউতারো মার্টিনেজের বিখ্যাত উদযাপন করবেন। ৩৪ বছর বয়সী এই লেগ স্পিনারের কাছে বিশ্বকাপে ফেরা মানে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি একটি প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন। তিনি চান, ভবিষ্যতের ইতালিয়ান ক্রিকেটারদের যেন তার মতো বাধার পাহাড় টপকাতে না হয়। একদিন তিনি কোচ হয়ে এই খেলাটির পাশে থাকতে চান।

পিৎজার চুলার আগুন এবং ক্রিকেটের স্পিন – দুটিই ঘূর্ণায়মান। একটিতে জীবিকা, অন্যটিতে জীবন। ক্রিশান কালুগামাগে প্রমাণ করে চলেছেন যে, স্বপ্ন যদি সত্যিই নিজের হয়, তবে তা একদিন না একদিন বিশ্বমঞ্চের আলোয় ঠিকই জ্বলে ওঠে।