মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার বিরোধী শিবিরে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা। বিশেষ করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলটিরই দুই হেভিওয়েট নেতা বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে নামায় শিবচর বিএনপি এখন স্পষ্টত তিন ভাগে বিভক্ত। দলটির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে ১০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর বর্তমানে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১০ জন প্রার্থী। ভোটারদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই ত্রিমুখী লড়াই।
মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য ও শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা আক্তার। তবে তার প্রার্থিতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে রয়েছেন দলটির সদ্য বহিষ্কৃত দুই প্রভাবশালী নেতা। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু ‘ফুটবল’ প্রতীক এবং উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল জামান মোল্লা ‘জাহাজ’ প্রতীক নিয়ে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে কেন্দ্র থেকে তাদের দুজনকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠ পর্যায়ে তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিচ্ছেন। এই বিভক্তির কারণে সাধারণ ভোটার ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বিএনপির এই অনৈক্যের সুযোগ নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা। জামায়াতে ইসলামী এই আসনে খেলাফত মজলিসকে সমর্থন দেওয়ায় ‘রিকশা’ প্রতীক নিয়ে তিনি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শহীদ জিয়ার আদর্শ মেনে তার পরিবার দীর্ঘকাল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দলের কঠিন সময়ে তারা হাল ছাড়েননি। তিনি বিদ্রোহীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলের স্বার্থে সবাইকে ধানের শীষের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী লাবলু জানান, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এবং প্রতিকূল পরিবেশেও নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার দাবি করে তিনি বলেন, জনগণের ভালোবাসায় তিনি নির্বাচিত হয়ে শিবচরকে চাঁদাবাজমুক্ত করতে চান। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী কামাল জামান মোল্লা অভিযোগ করেন, তাকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েও পরে ষড়যন্ত্র করে বাদ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের দাবির মুখে তিনি নির্বাচন করছেন এবং জয়ী হয়ে এই আসনটি দলকে উপহার দিতে চান।
১০ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সাঈদ উদ্দিন আহমেদ হানজালা মনে করেন, প্রধান বিরোধী শিবিরে বিভক্তি তাকে বাড়তি সুবিধা দেবে। তিনি শিবচরকে একটি আধুনিক ও ইনসাফভিত্তিক মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হোসাইন পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।
এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির জহিরুল ইসলাম মিন্টু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আবদুল আলী, গণঅধিকার পরিষদের রাজিব মোল্লা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমরান হাসান। সব মিলিয়ে মাদারীপুর-১ আসনে একটি বহুমাত্রিক নির্বাচনী লড়াইয়ের অপেক্ষায় রয়েছেন ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটবে নাকি জোট প্রার্থীরা এর ফায়দা তুলবেন, তা দেখতে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 



















