ঢাকা ১০:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

একটি বৈষম্যহীন অভিবাসন ব্যবস্থার স্বপ্ন: রেমিট্যান্স মেশিনের আড়ালে মানবিক আর্তনাদ

বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনে ২০২৫ সাল একটি ঐতিহাসিক বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ গত ২৫ বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই অর্থনৈতিক সাফল্যের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের কান্না, শোষণ এবং রাষ্ট্রীয় চরম অবহেলার গল্প। রাষ্ট্র এখনো প্রবাসীদের কেবল ‘রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন’ বা সংখ্যা হিসেবে দেখছে, যা শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়াকে অমানবিক করে তুলেছে।

অভিবাসন খাতের এই সংকট নিরসনে এবং প্রবাসীদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে তার প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শ্রমিকের ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ চললেও, বাজেটে তাদের কল্যাণে বরাদ্দ কমানোর মতো বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছ থেকে একদমই প্রত্যাশিত ছিল না।

২০২৫ সালের শ্রম অভিবাসনের সবচেয়ে করুণ দিকটি ফুটে উঠেছে নারী কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্নে। বিদেশে কর্মরত নারীরা প্রতিনিয়ত শোভন কর্মপরিবেশের অভাব এবং গৃহকর্তার অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন, এমনকি অনেকে লাশ হয়ে ফিরছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নারী অভিবাসনের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের গড়ে তোলা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট শ্রমিকদের জিম্মি করে রেখেছে। কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি ফির চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই শোষণ চক্রে খোদ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নীতিনির্ধারকরা জড়িত, যা তদারকি ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিয়েছে।

২০২৫ সালের বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধক্ষেত্রে সরল কর্মীদের প্রতারণামূলকভাবে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা। ভালো বেতন ও নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আধুনিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই অন্ধকারের মাঝেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষ করে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান এবং জাপানের সঙ্গে বিনা খরচে দক্ষ কর্মী পাঠানোর চুক্তিগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু নীতিমালায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও বাজেটে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা এ খাতের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলারই প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিবাসন খাতের সংকট কাটাতে প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। অভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য একটি পৃথক ক্যাডার সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া সংসদ সদস্য বা তাদের পরিবারের সদস্যদের রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স না দেওয়ার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীরা শুধু আয়ের উৎস নন, তারাও এদেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কোনো দয়া নয়, বরং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। সরকারকে নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন একটি বৈষম্যহীন অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি শ্রমিকের জীবন ও সম্মান সুরক্ষিত থাকবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে ‘রাতের ভোট’ হবে ইতিহাস: আলী রিয়াজ

একটি বৈষম্যহীন অভিবাসন ব্যবস্থার স্বপ্ন: রেমিট্যান্স মেশিনের আড়ালে মানবিক আর্তনাদ

আপডেট সময় : ০২:০৯:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনে ২০২৫ সাল একটি ঐতিহাসিক বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ গত ২৫ বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে এই অর্থনৈতিক সাফল্যের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের কান্না, শোষণ এবং রাষ্ট্রীয় চরম অবহেলার গল্প। রাষ্ট্র এখনো প্রবাসীদের কেবল ‘রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন’ বা সংখ্যা হিসেবে দেখছে, যা শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়াকে অমানবিক করে তুলেছে।

অভিবাসন খাতের এই সংকট নিরসনে এবং প্রবাসীদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে তার প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শ্রমিকের ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ চললেও, বাজেটে তাদের কল্যাণে বরাদ্দ কমানোর মতো বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছ থেকে একদমই প্রত্যাশিত ছিল না।

২০২৫ সালের শ্রম অভিবাসনের সবচেয়ে করুণ দিকটি ফুটে উঠেছে নারী কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্নে। বিদেশে কর্মরত নারীরা প্রতিনিয়ত শোভন কর্মপরিবেশের অভাব এবং গৃহকর্তার অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন, এমনকি অনেকে লাশ হয়ে ফিরছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নারী অভিবাসনের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের গড়ে তোলা সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট শ্রমিকদের জিম্মি করে রেখেছে। কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে সরকারি ফির চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই শোষণ চক্রে খোদ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নীতিনির্ধারকরা জড়িত, যা তদারকি ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিয়েছে।

২০২৫ সালের বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধক্ষেত্রে সরল কর্মীদের প্রতারণামূলকভাবে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা। ভালো বেতন ও নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আধুনিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই অন্ধকারের মাঝেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষ করে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান এবং জাপানের সঙ্গে বিনা খরচে দক্ষ কর্মী পাঠানোর চুক্তিগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু নীতিমালায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও বাজেটে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা এ খাতের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলারই প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিবাসন খাতের সংকট কাটাতে প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। অভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য একটি পৃথক ক্যাডার সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া সংসদ সদস্য বা তাদের পরিবারের সদস্যদের রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স না দেওয়ার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসীরা শুধু আয়ের উৎস নন, তারাও এদেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের কোনো দয়া নয়, বরং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। সরকারকে নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন একটি বৈষম্যহীন অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রতিটি শ্রমিকের জীবন ও সম্মান সুরক্ষিত থাকবে।