ঢাকা ০৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নতুন পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস সংশোধন: উঠে এলো ভোট ডাকাতি ও জুলাই বিপ্লবের চিত্র

চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় ধরনের সংস্কার করা হয়েছে। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ‘নিশুতি রাতের’ ভোট ডাকাতির ইতিহাস এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, শহীদ আবু সাঈদের বীরত্বগাথা এবং ছাত্র-জনতার বিপ্লবের তথ্য নতুন প্রজন্মের পাঠ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের সঠিক ইতিহাস জানাতে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতেই এই পরিমার্জন করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিন থেকেই সংশোধিত এই বইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের গুণমান ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। বিশেষ করে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ে ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে ‘চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এই অধ্যায়গুলোতে জুলাই বিপ্লবের প্রতীকী বীর শহীদ আবু সাঈদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ে। সেখানে ১৯৭৫ সালের ‘বাকশাল’ গঠন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তিনি সংকট তৈরি করেন, যার ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার মতো প্রতারণামূলক ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীদের জানানো হচ্ছে যে, বিগত ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘চোরতন্ত্রের’ মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমাতে ছাত্রলীগ ও সরকারি বাহিনী যখন নির্বিচারে দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, গণপ্রতিরোধের মুখে কোনো নিপীড়ক শাসকই টিকে থাকতে পারে না।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, ইতিপূর্বে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবকে নিয়ে যেসব অতিরঞ্জিত ও অযাচিত তথ্য ছিল, সেগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে। আগামী প্রজন্ম যাতে সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাসের আলোকে গড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর নিশ্চিত করেছেন যে, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ও এনসিসিসি-র অনুমোদনের পরেই এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি রাশিয়ার; পাল্টা হামলায় উত্তাল কাস্পিয়ান সাগর

নতুন পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস সংশোধন: উঠে এলো ভোট ডাকাতি ও জুলাই বিপ্লবের চিত্র

আপডেট সময় : ০১:২৫:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় ধরনের সংস্কার করা হয়েছে। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ‘নিশুতি রাতের’ ভোট ডাকাতির ইতিহাস এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, শহীদ আবু সাঈদের বীরত্বগাথা এবং ছাত্র-জনতার বিপ্লবের তথ্য নতুন প্রজন্মের পাঠ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের সঠিক ইতিহাস জানাতে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতেই এই পরিমার্জন করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিন থেকেই সংশোধিত এই বইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের গুণমান ও বিষয়বস্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। বিশেষ করে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ে ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে ‘চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এই অধ্যায়গুলোতে জুলাই বিপ্লবের প্রতীকী বীর শহীদ আবু সাঈদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ে। সেখানে ১৯৭৫ সালের ‘বাকশাল’ গঠন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদের উত্থান পর্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তিনি সংকট তৈরি করেন, যার ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করার মতো প্রতারণামূলক ঘটনা ঘটে।

শিক্ষার্থীদের জানানো হচ্ছে যে, বিগত ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘চোরতন্ত্রের’ মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে দমাতে ছাত্রলীগ ও সরকারি বাহিনী যখন নির্বিচারে দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে যে, গণপ্রতিরোধের মুখে কোনো নিপীড়ক শাসকই টিকে থাকতে পারে না।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, ইতিপূর্বে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবকে নিয়ে যেসব অতিরঞ্জিত ও অযাচিত তথ্য ছিল, সেগুলো পরিমার্জন করা হয়েছে। আগামী প্রজন্ম যাতে সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ইতিহাসের আলোকে গড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর নিশ্চিত করেছেন যে, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ ও এনসিসিসি-র অনুমোদনের পরেই এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে।