ঢাকা ০৫:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে ছয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার খোলা চিঠি: আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • ৫৮ বার পড়া হয়েছে

ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে একগুচ্ছ ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে এই চিঠিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—গুম-খুনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া।

মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার এই সংস্থাগুলো হলো—সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। গত রোববার (২০ অক্টোবর) এই খোলা চিঠিটি এইচআরডব্লিউ’র নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

চিঠিতে জুলাই বিপ্লব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন সংস্কারের উদ্যোগ এবং গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত শুরু করায় প্রশংসা করা হয়েছে। তবে একইসঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকালে ও গত ১৫ বছরে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতনসহ সব গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়া, সংস্থাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যে, তারা যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে। একইসঙ্গে, নিরাপত্তা খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে র‍্যাবকে বিলুপ্ত করার এবং গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। প্যারিস প্রিন্সিপাল অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে চিঠিতে।

আইনি সংস্কার প্রসঙ্গে সংস্থাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, ২০২৫ সালের সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং মানহানির ধারা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সংশোধন করতে হবে। খসড়া ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং খসড়া জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশকেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ছয়টি আরও জোর দিয়ে বলেছে, সরকার যেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে এবং সাংবাদিকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। তাদের মতে, ২০২৪ সালের আগে ও পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা সব মামলা বাতিল করতে হবে এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বর্তমানে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছর জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করেছিল জাতিসংঘ। চিঠিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুপারিশ ছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকারের এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিরাট সংখ্যক ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এ দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। পরে গত ১০ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১২ মে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর সংস্কার করে বিদেশি তহবিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা উচিত। এছাড়া, রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধ করে তাদের চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাগুলো। সর্বশেষ, রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) চলমান মামলায় অন্তর্বর্তী সরকার যেন আইসিসিকে পূর্ণ সহযোগিতা করে এবং চাহিদা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর করে, সেই আহ্বানও জানানো হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে ছয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার খোলা চিঠি: আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান

আপডেট সময় : ০৯:১৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে একগুচ্ছ ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে এই চিঠিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—গুম-খুনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়া।

মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সোচ্চার এই সংস্থাগুলো হলো—সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। গত রোববার (২০ অক্টোবর) এই খোলা চিঠিটি এইচআরডব্লিউ’র নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

চিঠিতে জুলাই বিপ্লব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন সংস্কারের উদ্যোগ এবং গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত শুরু করায় প্রশংসা করা হয়েছে। তবে একইসঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকালে ও গত ১৫ বছরে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতনসহ সব গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়া, সংস্থাগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যে, তারা যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করে। একইসঙ্গে, নিরাপত্তা খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে র‍্যাবকে বিলুপ্ত করার এবং গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। প্যারিস প্রিন্সিপাল অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে চিঠিতে।

আইনি সংস্কার প্রসঙ্গে সংস্থাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, ২০২৫ সালের সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং মানহানির ধারা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সংশোধন করতে হবে। খসড়া ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং খসড়া জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশকেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা ছয়টি আরও জোর দিয়ে বলেছে, সরকার যেন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে এবং সাংবাদিকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক হওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। তাদের মতে, ২০২৪ সালের আগে ও পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা সব মামলা বাতিল করতে হবে এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর বর্তমানে জারি থাকা নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছর জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করেছিল জাতিসংঘ। চিঠিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুপারিশ ছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকারের এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিরাট সংখ্যক ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এ দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। পরে গত ১০ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১২ মে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর সংস্কার করে বিদেশি তহবিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা উচিত। এছাড়া, রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধ করে তাদের চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা ও শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাগুলো। সর্বশেষ, রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) চলমান মামলায় অন্তর্বর্তী সরকার যেন আইসিসিকে পূর্ণ সহযোগিতা করে এবং চাহিদা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তর করে, সেই আহ্বানও জানানো হয়েছে।