৬
৮ নভেম্বর ১৯৮৭, সন্ধ্যা ৬টা ২০
কামরায় সত্যি সত্যিই আলো জ্বালানো, সঙ্গে ফ্যানটাও ঘুরছে বনবন করে। বৃষ্টিভেজা শীতের রাতে মোকামের শরীর তিরতির করে কেঁপে ওঠে। সে সুইচ টিপে ফ্যান বন্ধ করে দেয়, তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পুরো কামরা পর্যবেক্ষণ করে। রুমে যা কিছু যেভাবে ছিল, তা সব আগের মতোই আছে। তবে সকালে যেমনটা দেখেছে, খাটিয়ার একটা পায়া আসলেই ভাঙা। মোকাম ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে তার সামনে। আলনা, অল্পস্বল্প জামাকাপড় কাঁধে নিয়ে এখনো জায়গামতো দাঁড়িয়ে। শোকেস, ওয়ার্ডরোবও আগের মতোই, ঠিকঠাক। বাথরুমের দরজার পাশে, দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে খাড়া করে রাখা তার স্পঞ্জের স্যান্ডেল দুটো শুকনো। মোকাম চট করে বাথরুমেও উঁকি মারে। মেঝে খটখটে শুকনো। ব্যবহার করা হয়নি সারা দিনে। প্রতিদিন পত্রিকা অফিস থেকে ফিরে এসে যেমনটা দেখা যায়, ঠিক তেমনই আছে। কোঁচকানো ভ্রু আরও কুঁচকে সে এগিয়ে চলে রান্নাঘরের দিকে।
সরু সাপের মতো শীতল হাওয়ার একটা প্রবাহ ভেসে আসছিল কামরার ভেতর। অবশেষে তার উৎস খুঁজে পাওয়া যায়; রান্নাঘরের জানালার কপাট খোলা। চুলার পাশে মোকামের মেলামাইনের থালাটা পড়ে আছে। তার ওপর সেদ্ধ আলুর একগাদা ছিলকে, আর কামড়ে ফেলে রাখা আধখানা আলু। কে কামড়েছে এভাবে? পেঁয়াজ-মরিচ-শরিষার তেল দিয়ে ভর্তা করে, ধোঁয়াওঠা গরম ভাত দিয়ে বেশ এক পেট খাওয়া যেত। মোকামের ঠোঁট জোড়া আপনাতেই গোল হয়ে আসে। শিস বাজাতে বাজাতে সে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেয়। বৃষ্টির ছাট খোলা জানালা দিয়ে অল্প অল্প করে ঢুকছে ভেতরে। মোকাম আরও খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়ালে দোতলায় মৌলীর বারান্দা দেখতে পায়। মৌলী নেই, কিন্তু মৌলীর ভেজা শরীরের সঙ্গে লেপটে পানি শুষে নেওয়া নিঃসঙ্গ গামছাটা এখনো দুলছে বাতাসে। মোকামের বুকের মধ্যে এক পরিচিত হাহাকার ঘাই দেয়।
চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ানোমাত্রই মোকামের পা সেঁধিয়ে যায় রান্নাঘরের মেঝেতে। দরজায় সকালের সে ড্রাগন সাইজের টিকটিকি! হাতে সকালের সেই শলার ঝাড়ু। দুজনে কিছুক্ষণ বিনাবাক্যব্যয়ে একে-অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর টিকটিকি ঠুস করে মোকামের দিকে তরবারির মতো উঁচু করে ধরে সে ঝাঁটাখানা। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোকামের কণ্ঠার সাথে সেটা আলগোছে ঠেসে ধরে, যেমন করে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের গলায় তলোয়ার ঠেকিয়ে ধরে বিজেতা।
মোকাম অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় প্রাণীটার দিকে। সন্দেহ নেই, সকালের সে টিকটিকিই। প্রমাণসাইজের অনেক অনেক গুণ বড়। শীতল কুতকুতে চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এখন এই জন্তুটা তাকে ঠুন্ডা পিছা দিয়ে ঝাঁটাপেটা করবে? প্রতি শুক্রবার দুপুরবেলা বিটিভিতে দেখানো বাংলা সিনেমার শেষ সিনে পুলিশ এসে হাজির হলে গুন্ডারা মাথার ওপর হাত তুলে সারেন্ডার করে। সে নিজে কি গুন্ডা নাকি নায়ক—এ ব্যাপারে মোকাম চট করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু বুঝতে পারে, বিনা শর্তে সারেন্ডার করাটা তাকে এ মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত এক লড়াই থেকে বাঁচিয়ে দেবে। তাই সে অ্যাকশনের বিপরীতে পাল্টা অ্যাকশনে যাওয়ার বদলে জলদি জলদি দুহাত মাথার ওপরে তুলে দাঁড়ায়। এতে করে যদি মান-সম্মান কিছু বাঁচে! যদি টিকটিকির হাতে ঝাঁটাপেটা হওয়া থেকে বাঁচা যায়!
মোকামকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে টিকটিকি সেই ল্যাগব্যাগে ঝাড়ু তার কণ্ঠার ওপর থেকে সরিয়ে ফেলে। পেছনের বাঁকানো দুই পায়ে ভর দিয়ে, লম্বা শরীরজুড়ে ঢেউ খেলিয়ে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে সে ঝাড়ু দিতে আরম্ভ করে—খাটের নিচ, জানালার পাশ, আলনা, বারান্দা আর বাথরুমের সামনের দিকটা।
মোকাম একা মানুষ। ঘুম কম হলে সেদিন তার মাথা ধরে থাকে, এ ছাড়া এটা-সেটা নানা কারণে তার প্রায়ই মাথাব্যথা হয়, তবে অগোছালো ঘরদোর কখনোই তার মাথাব্যথার কারণ হতে পারেনি। তার এ কামরায় বাইরের কোনো মানুষের তেমন যাওয়া-আসা না থাকায় কামরা পরিপাটি, ঝকঝকে-তকতকে করে রাখারও কোনো দায় অনুভব করে না সে। আজ প্রথমবারের মতো অন্য কারও চোখে তার অগোছালো, ধুলোমলিন জীবন ধরা পড়বার কারণে মোকামের বেশ লজ্জা লাগে। সে লজ্জা তাকে কিছুক্ষণ আগে টিকটিকির কাছে বিনা যুদ্ধে সারেন্ডার করার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। ততক্ষণে টিকটিকি দ্রুতগতিতে ঘরদোর ঝাঁট দিয়ে ধুলো-ময়লাগুলো একটা পলিথিনে ভরে ফেলেছে।
‘যাওয়ার সময় লগে কইরা নিয়া গিয়া বাইরে ফেলায়া দিয়েন,’ মোকামের নাক বরাবর সে পলিথিনটা তুলে ধরে। ‘খুব ব্যস্ত মানুষ আপনে দেখা যাইতেছে। ঘরদোর ঝাড়পোঁছ করার সময় হয় না। কী পরিমাণ রাবিশ জমছে, দেখছেন?’ টিকটিকি সে পলিথিন মোকামের নাকের সামনে কিছুক্ষণ নাচিয়ে রেখে দেয় সদর দরজার পাশে। তারপর সামনের দুহাত (বা দুই পা) পিছমোড়া করে ধরে পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে অবিকল মানুষের মতো পায়চারি করে বেড়ায় কামরাজুড়ে। দেখা যায়, টিকটিকিরও ভ্রু কোঁচকানো। তাকে চিন্তিত লাগে। টিকটিকির ভ্রু থাকে? মোকামের জানা নেই। কত কিছু অজানা রয়ে গেল একজীবনে। টিকটিকিটা আসলে কে, কোথা থেকে কার কাছে এসেছে, মোকামের কাছে তার কী দরকার ইত্যাদি বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। কিন্তু ওর চিন্তাগ্রস্ত কপালে ভাঁজের সংখ্যা দেখে মোকামের সংশয় হয়। মনে হয়, টিকটিকিটার নিজের জীবন তার জীবনের চেয়ে আরও বেশি জটিল সব সমস্যায় আকীর্ণ। মোকামের আর মুখ ফুটে প্রশ্ন করা হয়ে ওঠে না।
পায়চারি করতে থাকা টিকটিকির হঠাৎ চোখ গিয়ে পড়ে মেঝেতে পড়ে থাকা লেজটার ওপর। সকালে মোকামের ঝাড়ুর বাড়ি খেয়ে নাস্তানাবুদ লেজটা এখনো ঢোঁড়া সাপের মতো টান টান শুয়ে। মোকামের কোঁচকানো ভ্রু তার ছোট সাইজের কপালের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে প্রায় মাথার কেশ ছুঁই ছুঁই করে। কামরায় ঢোকার পর যখন পুরো ঘর সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল, লেজটা তার চোখে পড়েনি। টিকটিকি এগিয়ে গিয়ে নেতিয়ে পড়ে থাকা লেজটাকে হাতে তুলে নেয়। ভেতরে-ভেতরে টিকটিকির লেজের মতোই নেতিয়ে থাকা মোকাম ঘোরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটা লক্ষ করে। এত দিন তার ধারণা ছিল টিকটিকির আঙুল প্রতি পায়ে সাকল্যে তিনটা। টিকটিকিরও যে মানুষের মতোই পাঁচটা করে আঙুল থাকে, লেজ তোলায় ব্যস্ত টিকটিকির হাতের দিকে তাকিয়ে তা সে জীবনে প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করে। টিকটিকির মুঠোয় উঠে আসা মাত্র নেতিয়ে পড়া লেজে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। সে লেজ পানি থেকে তুলে আনা বাইন মাছের মতো ছটফটিয়ে ওঠে। টিকটিকি তার ডান হাত (অথবা সামনের ডান পা) দিয়ে লেজটাকে শরীরের পেছন দিকে, পশ্চাদ্দেশের একটু ওপরে, যেখানে ওটা লেগে থাকার কথা, সেখানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দেখা যায়, তার হাতের দৈর্ঘ্যরে কারণে সে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। এরপর সে এক অভূতপূর্ব উপায়ে, পেছনের দুই পা কীভাবে যেন একটু উঁচু করে তার মাথা, সামনের দুই হাত এবং সমস্ত শরীর গলিয়ে দেয় সে দুই পায়ের নিচে সৃষ্টি হওয়া ফোকর দিয়ে। তারপর পেছনের দিকে, যেখানে লেজটা থাকার কথা, তার কাছাকাছি লেজ পাকড়ে ধরা হাতের মুঠোখানা নিয়ে যাওয়ামাত্রই ‘ক্লিক’ করে একটা শব্দ হয় এবং লেজটা জায়গামতো ঝুলে পড়ে। টিকটিকি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঘাড় কয়েকবার রেয়ার অ্যাঙ্গেলে ঘুরিয়ে, ডানে-বামে ফিরে ঝুলে থাকা লেজটার পজিশন তদারক করার চেষ্টা করে। যেভাবে সেটা ঝুলে আছে, তাতে তাকে সন্তুষ্ট মনে হয় না। খানিকক্ষণ এপাশ-ওপাশ, এধার-ওধার করবার পর সে পুনরায় তার দুই পায়ের ফাঁকে মাথা গলিয়ে দেয় এবং পাছার ওপর দু-চারটা খোঁচা মেরে লেজের জায়গামতো ঝুলে থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। তারপর খুশিমনে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পেছনে লেজটা তখনো বাম থেকে ডান—ডান থেকে বাম—আবার বাম থেকে ডানে দুলছে। টিকটিকি চাবুকের মতো সপাং সপাং আওয়াজ তুলে কয়েকবার সে লেজ মেঝেতে আছাড় মারে। এরপর মোকামের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে বলে, ‘এইবার ঠিক হইছে, তাই না, স্যার?’
উত্তরে তার কী বলা উচিত, ভেবে না পেয়ে মোকাম মুখে বোকা বোকা একটা হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। টিকটিকির সঙ্গে সকাল সকাল মারপিট, তারপর সাঁঝবেলায় ফিরে এসে অফ গার্ডে ধরা খাওয়া, সারেন্ডার করা—সবকিছু পার করে এসে, অবশেষে যেন সে পুরো ব্যাপারটার অস্বাভাবিকতা আঁচ করতে পারছে। তবে এখনো তার পক্ষে দুইয়ে-দুইয়ে চার মেলানো সম্ভব হচ্ছে না। মোকামের স্মরণে আসে দাদির মুখে ছোটবেলায় শোনা পিরানে পীর দস্তগির গাউসে আজম বড়পীর আবদুল কাদের জিলানির এক গল্প।
গহিন জঙ্গলে শিকার খুঁজে ফেরা এক শিকারির জালে একবার এক হরিণী আটকা পড়ে। আটক হরিণী শিকারিকে বলে, তার শাবক জঙ্গলের গহিনে একা পড়ে আছে। সে কেবল একবার তার বাচ্চাকে দুধ খাইয়ে আসতে চায় এবং তাকে তার দুর্দশার কথা জানিয়ে শেষ বিদায় নিয়ে আসতে চায়। শিকারি তো কোনোভাবেই তার কথা মানতে রাজি নয়। সে তক্ষুনি বধ করবে হরিণীকে। এমন সময় সেখানে দৈবক্রমে এসে হাজির হন বড়পীর। হরিণী তার কাছে সব কথা খুলে বলে সাহায্য ভিক্ষা চায়। বড়পীর তখন সে শিকারির কাছে নিজেকে বন্ধক রেখে হরিণীর সাময়িক মুক্তির আরজি পেশ করেন। শিকারি গড়িমসি করে অবশেষে রাজি হয়। লোকটা বড়পীরকে সে স্থানে জিম্মি হিসেবে কষে বেঁধে রেখে হরিণীকে সময় বেঁধে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে আরও শিকারের খোঁজে। সারা দিন জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে শিকার করবার পর শেষ বিকেলে আগে থেকে নির্ধারণ করা জায়গায় ফিরে এসে সে দেখতে পায়—বড়পীরের হাতের পায়ের বাঁধন অলৌকিক উপায়ে খোলা, আর হরিণী ঠিক তার সামনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে বড়পীরের হাতে কাঁঠালপাতা খাচ্ছে। এরপর শিকারি-বড়পীর-হরিণীর যে ত্রিমুখী আলাপ হয়, তার যে একটা এজুকেশনাল ভ্যালু আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গল্পের সঙ্গে মোকামের বর্তমান অবস্থার প্রাসঙ্গিকতা এই জায়গায় যে বোবা জানোয়ারের সাথে আলাপ তো বড়পীরের কারামত। ধর্মের ডোমেইনের বাইরে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু মার্ক্স চাচার লেখাপত্রে প্রভাবিত মোকাম কীভাবে কথা বলছে একটা জানোয়ারের সঙ্গে? কীভাবে বুঝতে পারছে একটা টিকটিকির মুখের ভাষা? তবে কি পীর মার্ক্সের অগোচরে, এমনকি নিজেরও অজান্তে সে উপনীত হল কালান্দারি দরবেশে?
মোকাম চোখ সরু করে দাঁড়িয়ে থাকে।চলবে
রিপোর্টারের নাম 

























