ঢাকা ০৯:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণভোটের সময় নিয়ে চরম বিরোধ, কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৫:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ৮৮ বার পড়া হয়েছে

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। একদিকে, অন্যতম প্রধান দল বিএনপি চাইছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিনই এই গণভোট হোক। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি-সহ ইসলামপন্থী দলগুলো তাদের অবস্থানে অনড়—তারা চায় জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সিদ্ধান্ত জানা হোক।

এমন বিভক্তিমূলক পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি এই বিভাজন চলতে থাকে, তবে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি হয়তো আর সমঝোতার অপেক্ষা না করে একটি সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করে সরকারের সব পক্ষকে জানিয়ে দেবেন।

সরকারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত গণভোটের সময় নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো সমঝোতার আভাস মেলেনি। একইসঙ্গে, সরকারের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন পক্ষ দিনক্ষণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। উল্লেখ্য, আগামী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে সরকারকে সম্ভাব্য দিনক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হবে। কমিশনের প্রস্তাব অনুসারেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নিতে গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও এখনো কোনো দিনক্ষণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। কমিশনের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এখনও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য দেখা যায়নি। গণভোট কবে নাগাদ হতে পারে, এ নিয়ে আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি। আলোচনা চলছে সব পক্ষের মধ্যে, সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”

ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সূত্র ব্যাখ্যা করেছে যে, উভয়পক্ষের যুক্তির সারবত্তা আছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট হলে দলগুলো সনদের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করত, যা সনদের প্রতি জনসম্মতি বাড়াতে পারত। কিন্তু নির্বাচনের দিন গণভোট হলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতীকের বিজয়ের দিকেই বেশি মনোযোগী হবে, ফলে জুলাই সনদের গুরুত্ব কমতে পারে।

সোমবার (১৩ অক্টোবর) রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়। তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্যরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট করার পক্ষে মত দেন। ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ-সহ অন্যান্য নেতারা নির্বাচনের আগে গণভোটকে ‘জাতীয় নির্বাচন পেছানোর চক্রান্ত’ হিসেবেই দেখছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “আমরা চাই, যেদিন জাতীয় নির্বাচন হবে সেদিনই জুলাই সনদের ওপর গণভোট নিতে হবে। বিএনপি এটাই মনে করে।”

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচন কমিশন এত অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আগে আলাদাভাবে গণভোট করতে সক্ষম কিনা। তবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, এই নির্বাচন আয়োজনে যে দু-আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য এসেছে, তা সরকারের জন্য বড় কোনো অঙ্ক নয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য আশা প্রকাশ করেন, শুক্রবারের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেলে ভালো। তবে তিনি প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত জটিল বলে মনে করেন এবং উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো ছোট ছোট বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে বড় বিপদ ডেকে আনছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের একজন সদস্যের পর্যবেক্ষণ, “পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। এর পেছনে একটি ধর্মভিত্তিক দলের ভূমিকা রয়েছে। কারণ জাতীয় নির্বাচন পেছালে তাদের সুবিধা হবে।”

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের একটাই লক্ষ্য, সেটা হচ্ছে নির্বাচনকে বিলম্বিত করা। আমরা তো প্রকৃতপক্ষে গণভোটে রাজি ছিলাম না, কিন্তু গ্রেটার ইউনিটির জন্য একমত হয়েছি যে নির্বাচনের দিন গণভোট হলে আমাদের আপত্তি নেই।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার নিয়ে নিলেও আমরা যদি দেখি আমাদের মতো হচ্ছে না, তাহলে ওই নির্বাচনে (গণভোটে) যাবো না।”

অন্যদিকে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, সরকার আরও সহজ অবস্থানে আসতে পারে। তিনি যুক্তি দেন যে, একদিনে গণভোট হলে ভোটাররা সংস্কার প্রস্তাবনার গুরুত্ব বুঝতে পারবে না এবং নির্বাচনে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা কেন্দ্রে ঝামেলা হলে গণভোটের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, “শুধু একজন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্বের ইগোকে প্রাধান্য দেবেন, না জনস্বার্থ, জনআকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেবেন—এটা হচ্ছে মূল ম্যাটার।” তিনি সরকারকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নেগেটিভলি অনেকে বলেন ‘এটা ইলেকশন পেছানোর অংশ। না! এটা আরেকটা মিসপ্রোপাগান্ডা।”

বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূস এই সময়ে নীরব থাকলেও জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফেরার পর তিনি বিগত সময়ের চেয়ে ‘অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে’ রয়েছেন। এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা বলেন, “ড. ইউনূস জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে যদি দ্রুততার সঙ্গে প্রজ্ঞাপন জারি করেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে না। তাকে সহযোগিতার বদলে ভিন্ন কিছু করলে তিনি আরও শক্ত হতে বাধ্য হবেন।” তার মতে, আওয়ামী লীগকে ফেরানোর বিষয়ে নোবেলজয়ী সরকারপ্রধানের বক্তব্য আদতে জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখার জন্য।

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা জোনায়েদ সাকি মনে করেন, “যা কিছু করা উচিত, তা ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করা উচিত।” মঞ্চের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আমার কাছে নির্বাচনের আগে-পিছের সময় তফাৎ করে না। ভোটের দিন হলে গণভোটের কোনো স্পিরিট থাকবে না, এটা আমি পারসোনালি ওপিনিয়ন দিচ্ছি। কিন্তু আমরা বিএনপির সঙ্গে অবস্থান ব্যক্ত করেছি।”

আগামী শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে সরকারি প্রস্তুতি রয়েছে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-সহ সরকারের দায়িত্বশীলরাও উপস্থিত থাকবেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরাকান আর্মির প্রধানের অভিনন্দন, নতুন বন্ধুত্বের বার্তা

গণভোটের সময় নিয়ে চরম বিরোধ, কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা

আপডেট সময় : ১০:০৫:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। একদিকে, অন্যতম প্রধান দল বিএনপি চাইছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের দিনই এই গণভোট হোক। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি-সহ ইসলামপন্থী দলগুলো তাদের অবস্থানে অনড়—তারা চায় জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সিদ্ধান্ত জানা হোক।

এমন বিভক্তিমূলক পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শক্ত অবস্থানে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি এই বিভাজন চলতে থাকে, তবে স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি হয়তো আর সমঝোতার অপেক্ষা না করে একটি সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারণ করে সরকারের সব পক্ষকে জানিয়ে দেবেন।

সরকারের সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) পর্যন্ত গণভোটের সময় নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো সমঝোতার আভাস মেলেনি। একইসঙ্গে, সরকারের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন পক্ষ দিনক্ষণ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। উল্লেখ্য, আগামী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, কমিশনের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে সরকারকে সম্ভাব্য দিনক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হবে। কমিশনের প্রস্তাব অনুসারেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি নিতে গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও এখনো কোনো দিনক্ষণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। কমিশনের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এখনও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য দেখা যায়নি। গণভোট কবে নাগাদ হতে পারে, এ নিয়ে আমরা এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি। আলোচনা চলছে সব পক্ষের মধ্যে, সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”

ঐকমত্য কমিশনের একাধিক সূত্র ব্যাখ্যা করেছে যে, উভয়পক্ষের যুক্তির সারবত্তা আছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট হলে দলগুলো সনদের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করত, যা সনদের প্রতি জনসম্মতি বাড়াতে পারত। কিন্তু নির্বাচনের দিন গণভোট হলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতীকের বিজয়ের দিকেই বেশি মনোযোগী হবে, ফলে জুলাই সনদের গুরুত্ব কমতে পারে।

সোমবার (১৩ অক্টোবর) রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়। তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্যরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট করার পক্ষে মত দেন। ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ-সহ অন্যান্য নেতারা নির্বাচনের আগে গণভোটকে ‘জাতীয় নির্বাচন পেছানোর চক্রান্ত’ হিসেবেই দেখছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “আমরা চাই, যেদিন জাতীয় নির্বাচন হবে সেদিনই জুলাই সনদের ওপর গণভোট নিতে হবে। বিএনপি এটাই মনে করে।”

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচন কমিশন এত অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচনের আগে আলাদাভাবে গণভোট করতে সক্ষম কিনা। তবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, এই নির্বাচন আয়োজনে যে দু-আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্য এসেছে, তা সরকারের জন্য বড় কোনো অঙ্ক নয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য আশা প্রকাশ করেন, শুক্রবারের মধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেলে ভালো। তবে তিনি প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত জটিল বলে মনে করেন এবং উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো ছোট ছোট বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি করে বড় বিপদ ডেকে আনছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের একজন সদস্যের পর্যবেক্ষণ, “পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। এর পেছনে একটি ধর্মভিত্তিক দলের ভূমিকা রয়েছে। কারণ জাতীয় নির্বাচন পেছালে তাদের সুবিধা হবে।”

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের একটাই লক্ষ্য, সেটা হচ্ছে নির্বাচনকে বিলম্বিত করা। আমরা তো প্রকৃতপক্ষে গণভোটে রাজি ছিলাম না, কিন্তু গ্রেটার ইউনিটির জন্য একমত হয়েছি যে নির্বাচনের দিন গণভোট হলে আমাদের আপত্তি নেই।” তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার নিয়ে নিলেও আমরা যদি দেখি আমাদের মতো হচ্ছে না, তাহলে ওই নির্বাচনে (গণভোটে) যাবো না।”

অন্যদিকে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, সরকার আরও সহজ অবস্থানে আসতে পারে। তিনি যুক্তি দেন যে, একদিনে গণভোট হলে ভোটাররা সংস্কার প্রস্তাবনার গুরুত্ব বুঝতে পারবে না এবং নির্বাচনে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা কেন্দ্রে ঝামেলা হলে গণভোটের পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, “শুধু একজন রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্বের ইগোকে প্রাধান্য দেবেন, না জনস্বার্থ, জনআকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেবেন—এটা হচ্ছে মূল ম্যাটার।” তিনি সরকারকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নেগেটিভলি অনেকে বলেন ‘এটা ইলেকশন পেছানোর অংশ। না! এটা আরেকটা মিসপ্রোপাগান্ডা।”

বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. ইউনূস এই সময়ে নীরব থাকলেও জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফেরার পর তিনি বিগত সময়ের চেয়ে ‘অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে’ রয়েছেন। এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা বলেন, “ড. ইউনূস জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের বিষয়ে যদি দ্রুততার সঙ্গে প্রজ্ঞাপন জারি করেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে না। তাকে সহযোগিতার বদলে ভিন্ন কিছু করলে তিনি আরও শক্ত হতে বাধ্য হবেন।” তার মতে, আওয়ামী লীগকে ফেরানোর বিষয়ে নোবেলজয়ী সরকারপ্রধানের বক্তব্য আদতে জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখার জন্য।

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা জোনায়েদ সাকি মনে করেন, “যা কিছু করা উচিত, তা ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করা উচিত।” মঞ্চের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আমার কাছে নির্বাচনের আগে-পিছের সময় তফাৎ করে না। ভোটের দিন হলে গণভোটের কোনো স্পিরিট থাকবে না, এটা আমি পারসোনালি ওপিনিয়ন দিচ্ছি। কিন্তু আমরা বিএনপির সঙ্গে অবস্থান ব্যক্ত করেছি।”

আগামী শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে সরকারি প্রস্তুতি রয়েছে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-সহ সরকারের দায়িত্বশীলরাও উপস্থিত থাকবেন।