উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হারে বড় ধরনের ধস নামায় দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি আসন ফাঁকা থাকার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, উত্তীর্ণ হওয়া মোট শিক্ষার্থীর সবাই যদি স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তিও হন, তবুও উচ্চশিক্ষার মোট আসনের অন্তত ৫৭ শতাংশ আসন খালি পড়ে থাকবে। মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং মধ্যম ও নিম্নসারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই শিক্ষার্থীসংকট চরম আকার ধারণ করতে পারে।
ইউজিসির তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে স্নাতক পর্যায়ে মোট আসন রয়েছে ১৪ লাখ ৯২ হাজার ২৮৮টি। এর বিপরীতে চলতি ২০২৬ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সব মিলিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। ফলে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ফাঁকা থেকে যাবে প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৩টি আসন। উল্লেখ্য, এবার গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা বিগত ২২ বছরের মধ্যে (২০০৪ সালের পর) সর্বনিম্ন।
পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আসনসংখ্যা ৬৩ হাজার ৬৫৬টি হলেও অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউট মিলিয়ে আসন রয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে কেবল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতেই স্নাতক স্তরে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি। অর্থাৎ, এবারের মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর সংখ্যার চেয়ে শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনই প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪১০টি বেশি। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে আরও ৪ লাখ ১০ হাজার।
মেধাতালিকায় শীর্ষ থাকা শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ থাকে সরকারি মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় করেন। ফলে এসব প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে ভর্তির তীব্র প্রতিযোগিতা বজায় থাকলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মফস্বলের কলেজ এবং নতুন অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ জানান, অধিভুক্ত কলেজগুলোতে কয়েক লাখ আসন ফাঁকা থাকার শঙ্কা দেখা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক চাপের মুখে পড়বে। এই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও কর্মমুখী কোর্স চালু করে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদেরও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার আওতায় আনার চিন্তাভাবনা চলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিগত সরকারের আমলে পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়ার সময়ে বাছবিচার ছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের অনুমোদন দিয়ে আসন বাড়ানো হয়েছে। এখন পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও কঠোর মূল্যায়নের বাস্তবতায় পাসের হার কমে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষার এই কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


























