মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০২:৪০ অপরাহ্ন | ১লা নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার, ১৬ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের বিদায় ও কঠোর মূল্যায়ন: এইচএসসির ফল কি শিক্ষার্থীদের আতঙ্কে ফেলছে?

  • হালনাগাদ সময় : ১২:২৮:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশজুড়ে পাসের হারের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে নতুন করে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। চলতি বছর এইচএসসিতে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। এর আগে এসএসসির ফলাফলেও প্রায় একই ধরনের পতন দেখা গেছে—পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ থেকে নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। অনেকেই এই ফলাফলকে ২০-২২ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মতে, দুই দশক আগের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকায় কেবল শুষ্ক পরিসংখ্যান দিয়ে এ মূল্যায়ন করা বিভ্রান্তিকর।

অতীতে স্তরভিত্তিক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে আশঙ্কাজনক ছিল, আজকের বাংলাদেশ সেখানে বহুলাংশে এগিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার ভেতরের নিয়মে বড় ধরনের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে, যা শিক্ষার্থীদের সামনে এক কঠিন ‘রিয়েলিটি চেক’ বা কঠোর বাস্তবতাকে হাজির করেছে। প্রথমত, করোনা মহামারির সময় থেকে চলে আসা ‘সংক্ষিপ্ত সিলেবাস’ নামক ছাড়ের সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নপত্র আগের চেয়ে বিশ্লেষণধর্মী ও কঠিন হয়েছে। তৃতীয়ত, উত্তরপত্র মূল্যায়নে আরোপ করা হয়েছে সর্বোচ্চ কঠোরতা। ফলে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বা জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা বন্ধ হয়ে প্রকৃত মেধার চিত্র ফুটে উঠছে।

তবে মূল্যায়নের এই কঠোরতা যেন শিক্ষার মূল আনন্দকে গ্রাস করে শিক্ষার্থীদের চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে ঠেলে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। অতীতে হেলিকপ্টার নিয়ে নকলবিরোধী অভিযানের মতো ঘটনা সাময়িক ভীতি তৈরি করলেও সাধারণ পরীক্ষার্থীদের জন্য তা পরীক্ষার হলে বাড়তি আতঙ্ক তৈরি করত। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পড়াশোনা করেই পরীক্ষায় বসে। তাই পরীক্ষার হলে অপ্রয়োজনীয় কড়াকড়ি, মোবাইল জার্নালিজমের দৌরাত্ম্য বা ভীতিকর পরিবেশ পরিহার করে একটি স্বাভাবিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া সাম্প্রতিক নীতিকে স্বাগত জানাচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। আগে মাত্র এক বা দুটি বিষয়ে ফেল করলে পুরো একটি বছর নষ্ট হওয়ার যে মানসিক গ্লানি থাকত, তা দূর করতে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার যে সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী। বিশেষ করে মফস্বলের নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ফল বিপর্যয়ের পর পরিবার থেকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তাৎক্ষণিক রি-টেস্টের ব্যবস্থা সেই সামাজিক ঝুঁকি অনেকাংশেই হ্রাস করবে।

ডিজিটাল দুনিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সর্বগ্রাসী বিস্তারের মাঝেও যেসব শিক্ষার্থী মনোযোগ ধরে রেখে ভালো ফলাফল করছেন, তাদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তবে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া বা পরীক্ষায় পাস করাই শিক্ষার শেষ কথা নয়। লাখ লাখ জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের বড় অংশই যখন পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা প্রমাণে হোঁচট খান, তখন সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির মান ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক গভীরতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই পরীক্ষা ও ফলাফলের কঠোরতার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে আনন্দের উপাদান ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের বাস্তবমুখী পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আগামীর প্রধান লক্ষ্য।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

খোকসার প্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়ায় লোকগানের সুরের মূর্ছনা

01 November 2026

সুনামগঞ্জে মদপানে মাতলামির অভিযোগে কৃষকদলের দুই নেতা আটক

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের বিদায় ও কঠোর মূল্যায়ন: এইচএসসির ফল কি শিক্ষার্থীদের আতঙ্কে ফেলছে?

হালনাগাদ সময় : ১২:২৮:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশজুড়ে পাসের হারের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে নতুন করে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। চলতি বছর এইচএসসিতে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশের তুলনায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ কম। এর আগে এসএসসির ফলাফলেও প্রায় একই ধরনের পতন দেখা গেছে—পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ থেকে নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। অনেকেই এই ফলাফলকে ২০-২২ বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মতে, দুই দশক আগের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকায় কেবল শুষ্ক পরিসংখ্যান দিয়ে এ মূল্যায়ন করা বিভ্রান্তিকর।

অতীতে স্তরভিত্তিক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার যেখানে আশঙ্কাজনক ছিল, আজকের বাংলাদেশ সেখানে বহুলাংশে এগিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার ভেতরের নিয়মে বড় ধরনের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে, যা শিক্ষার্থীদের সামনে এক কঠিন ‘রিয়েলিটি চেক’ বা কঠোর বাস্তবতাকে হাজির করেছে। প্রথমত, করোনা মহামারির সময় থেকে চলে আসা ‘সংক্ষিপ্ত সিলেবাস’ নামক ছাড়ের সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নপত্র আগের চেয়ে বিশ্লেষণধর্মী ও কঠিন হয়েছে। তৃতীয়ত, উত্তরপত্র মূল্যায়নে আরোপ করা হয়েছে সর্বোচ্চ কঠোরতা। ফলে কৃত্রিমভাবে পাসের হার বা জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা বন্ধ হয়ে প্রকৃত মেধার চিত্র ফুটে উঠছে।

তবে মূল্যায়নের এই কঠোরতা যেন শিক্ষার মূল আনন্দকে গ্রাস করে শিক্ষার্থীদের চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে ঠেলে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। অতীতে হেলিকপ্টার নিয়ে নকলবিরোধী অভিযানের মতো ঘটনা সাময়িক ভীতি তৈরি করলেও সাধারণ পরীক্ষার্থীদের জন্য তা পরীক্ষার হলে বাড়তি আতঙ্ক তৈরি করত। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পড়াশোনা করেই পরীক্ষায় বসে। তাই পরীক্ষার হলে অপ্রয়োজনীয় কড়াকড়ি, মোবাইল জার্নালিজমের দৌরাত্ম্য বা ভীতিকর পরিবেশ পরিহার করে একটি স্বাভাবিক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া সাম্প্রতিক নীতিকে স্বাগত জানাচ্ছেন শিক্ষাবিদরা। আগে মাত্র এক বা দুটি বিষয়ে ফেল করলে পুরো একটি বছর নষ্ট হওয়ার যে মানসিক গ্লানি থাকত, তা দূর করতে এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার যে সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী। বিশেষ করে মফস্বলের নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ফল বিপর্যয়ের পর পরিবার থেকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, তাৎক্ষণিক রি-টেস্টের ব্যবস্থা সেই সামাজিক ঝুঁকি অনেকাংশেই হ্রাস করবে।

ডিজিটাল দুনিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সর্বগ্রাসী বিস্তারের মাঝেও যেসব শিক্ষার্থী মনোযোগ ধরে রেখে ভালো ফলাফল করছেন, তাদের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তবে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া বা পরীক্ষায় পাস করাই শিক্ষার শেষ কথা নয়। লাখ লাখ জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের বড় অংশই যখন পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা প্রমাণে হোঁচট খান, তখন সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির মান ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক গভীরতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই পরীক্ষা ও ফলাফলের কঠোরতার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে আনন্দের উপাদান ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের বাস্তবমুখী পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আগামীর প্রধান লক্ষ্য।

Share this news as a Photo Card