ভারতের সাম্প্রতিক জেন-জি (Gen-Z) প্রতিবাদ আর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করলে এক চরম ও নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসে। কোনো রাষ্ট্রে প্রতিবাদের ভাষা, আন্দোলনের নান্দনিক প্রকাশ, তরুণদের রাজনৈতিক কল্পনা এবং দমনপীড়ন মোকাবিলার সক্ষমতা কতখানি কার্যকর হবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করে দেশটির বিদ্যমান গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর।
ভারতে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করে তরুণেরা ব্যঙ্গচিত্র আঁকতে পারছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় মকিং রিল তৈরি করছে কিংবা শাসকগোষ্ঠীর বক্তব্য নিয়ে প্রকাশ্য কৌতুক করে আন্দোলনকে এক ধরনের সম্মিলিত প্রতিবাদের উৎসবে রূপ দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে সেই অবকাশ বা সুযোগ ছিল না বললেই চলে। এদেশের তরুণদের জন্য রাজপথে দাঁড়ানোর নির্মম সমীকরণটিই ছিল সরাসরি প্রাণঘাতী বুলেট ও মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া; অথবা বেঁচে থাকা পর্যন্ত আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষার চরম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া।
এই আকাশ-পাতাল পার্থক্যের মূল কারণ বুঝতে হলে বিগত দেড় দশকের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন ও ফ্যাসিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের দিকে তাকাতে হবে। তবে একই সঙ্গে তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা, দুর্বল কৌশল এবং জনআকাঙ্ক্ষাকে সমন্বিত আন্দোলনে রূপ দিতে না পারার ঐতিহাসিক দায়কেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দ্রব্যমূল্য, সীমাহীন দুর্নীতি, ভোটাধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতো মৌলিক সংকটগুলোকে তৎকালীন বিরোধী শক্তিগুলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো সর্বজনীন রূপরেখা দিতে পারেনি।
সামাজিক আন্দোলনের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক চার্লস টিলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিচ্ছিন্ন ক্ষোভ যখন দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন লক্ষ্যে সুসংগঠিত হয়, তখনই তা সর্বপ্লাবী রূপ নেয়। বাংলাদেশের জুলাইয়ে ঠিক সেটাই ঘটিয়ে দেখিয়েছিল জেন-জি প্রজন্ম। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসকে পেছনে ফেলে সাধারণ মানুষ ভরসা রেখেছিল ২৬-২৭ বছরের অচেনা তরুণদের ওপর। কিন্তু সেই গণআস্থার বিপরীতে তরুণদের দিতে হয়েছে নজিরবিহীন রক্তের মূল্য।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং অঙ্গহানি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন হাজার হাজার তরুণ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ বা রাজনৈতিক সুরক্ষা ছাড়া বুক পেতে দিয়ে আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ কিংবা ওয়াসিমদের জীবন দিতে হয়েছে। ভারতে তরুণরা যখন প্রতীকীভাবে ‘তেলাপোকা পার্টি’ গঠন করে ব্যঙ্গাত্মক লড়াই চালাচ্ছে, বাংলাদেশের তরুণদের তখন বাস্তবিক অর্থেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যাঁতাকলে তেলাপোকার মতো পিষে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক কাঠামোতে বিরোধী দল কেবল ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ নয়, বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরক্ষাব্যূহ। সেই প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল ভেঙে পড়ায় তরুণদের নিজেদের শরীর ও জীবন বাজি রেখে রাষ্ট্র উদ্ধার করতে হয়েছে। এই আত্মত্যাগকে কেবল রোমান্টিক বীরত্বের মোড়কে বন্দি না রেখে প্রশ্ন তোলা জরুরি—কেন গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে তরুণদের বারবার শহীদ হতে হবে? রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন এক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিবাদের জন্য আর কাউকে বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হতে হবে না।

























