রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক আবহ, পুরান ঢাকার শতবর্ষী স্থাপত্য নিদর্শন, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের বিরল লীলাভূমি কুয়াকাটা কিংবা বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অপার রহস্য—প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এমন দুর্লভ সমাহার দক্ষিণ এশিয়ায় সত্যিই বিরল। তবে চোখজুড়ানো এই বিপুল প্রাকৃতিক প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ এক চরম উপেক্ষিত নাম।
ভৌগোলিক নৈকট্য থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড যেখানে বছরে ৩ কোটির বেশি বিদেশি পর্যটক টেনে এনে হাজার কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, সেখানে বাংলাদেশ পর্যটন খাতের উন্নয়নকে আটকে রেখেছে কাগুজে নীতি, আমলাতান্ত্রিক ফাইলবন্দি উদ্যোগ আর কাঠামোগত চরম অব্যবস্থাপনার বৃত্তে।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এই বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত নির্মম। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট বিদেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় নিম্নমুখী (২০২৪ সালে ৬ লাখ ৩৩ হাজার এবং ২০২৩ সালে ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার)। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে বিদেশি দর্শনার্থী আগমন উল্টো ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রকৃত অবকাশযাপনকারী বা লেজার ট্যুরিস্টের সংখ্যা মাত্র ১৫ শতাংশের কাছাকাছি; বাকিরা আসেন মূলত প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক কিংবা সীমান্ত পারাপারের প্রয়োজনে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও সিইআইসি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে মাত্র ৪৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের প্রত্যক্ষ অবদান ৩ শতাংশের নিচে।
বিপরীত চিত্র থাইল্যান্ডে। দেশটির পর্যটন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে পা রেখেছেন ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক। কেবল এই বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় থেকেই দেশটির আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি থাই বাথ)। অভ্যন্তরীণ আয়সহ দেশটির মোট পর্যটন অর্থনীতি ঠেকেছে ৮৬ বিলিয়ন ডলারে, যা থাইল্যান্ডের জিডিপিতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ অবদান রাখছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল ব্যবধানের মূলে রয়েছে অবকাঠামোগত চরম দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাব। একজন বিদেশি পর্যটক দেশে নামার পর বিমানবন্দর থেকেই লাগেজ জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হন। এরপর রাজধানী থেকে কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাতায়াত, অভ্যন্তরীণ রুটে অতিরিক্ত বিমানভাড়া এবং যানজট তাঁদের শুরুতেই নিরুৎসাহিত করে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও অতিরিক্ত মূল্য আদায়, অস্বাস্থ্যকর খাবার, সুপেয় পানির সংকট, মানহীন সেবা এবং চরম বর্জ্য অব্যবস্থাপনা তাঁদের হতাশ করে তোলে। যেখানে ব্যাংককের ‘চাও ফ্রায়া’ নদীকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ওয়াটার ট্যাক্সি, রিভার ক্রুজ ও আধুনিক পর্যটন বলয় গড়ে তুলে কোটি কোটি ডলার আয় করা হচ্ছে, সেখানে ঢাকার ‘বুড়িগঙ্গা’ ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও পরিণত হয়েছে দূষণ ও বর্জ্যের ভাগাড়ে।
নীতিগত দিক থেকেও বাংলাদেশ চরম স্থবিরতায় নিমজ্জিত। ২০১৯ সালে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আজও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। পাশাপাশি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বেজা এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’-এর মতো আগ্রাসী ডিজিটাল প্রচার, সহজ অন-অ্যারাইভাল ভিসা নীতি কিংবা টার্গেট অডিয়েন্সভিত্তিক কোনো আধুনিক ব্র্যান্ডিং বাংলাদেশের নেই।
ট্যুর অপারেটরদের মতে, শুধু প্রকৃতি থাকলেই পর্যটক আসে না; প্রয়োজন নিরাপত্তা, সহজ যোগাযোগ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞতা তৈরি করা। সুন্দরবন বা কুয়াকাটার মতো বিশ্বমানের সম্পদকে সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের ‘ইকো-ট্যুরিজম’ হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট ও টেকসই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া এই বৈশ্বিক অসম প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সম্ভব নয়।


























