প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের সবার। কিন্তু বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই স্বপ্ন রূপ নিচ্ছে গভীর হতাশায়। একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নেমে এসেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে। সরকারি চাকরিতে মাত্র কয়েক শ শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ছে লাখ লাখ। বিপরীতে বেসরকারি খাতেও নতুন বিনিয়োগে তীব্র স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় থমকে গেছে। উপরন্তু একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারাচ্ছেন নিয়মিত কর্মজীবীরাও। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের লাখো চাকরিপ্রত্যাশীর একটাই বড় প্রশ্ন—বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের কাঙ্ক্ষিত দরজা আসলে খুলবে কবে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজারে, যা আগের বছরের ২৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে এক লাফে ১ লাখ ৬০ হাজার বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই বেকারদের সিংহভাগই তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত। বিবিএসের তথ্য বলছে, বেকারদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা ব্যক্তিদের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকারের হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। অথচ আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক পৃথক প্রতিবেদনে আরও ভীতিপ্রদ চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে গড়ে ৩৬ জনই বেকার।
চাকরির বাজারের এই তীব্র সংকটের বড় প্রতিফলন দেখা যায় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে। সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মাত্র ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল তিন লাখের বেশি। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিযোগিতায় নামেন। সরকারি চাকরিতে চাকরির স্থায়িত্ব, নিয়মিত বেতন ও সামাজিক মর্যাদার প্রত্যাশায় তরুণদের এমন উপচে পড়া ভিড় থাকলেও পদসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু যেখানে অধিকাংশ চাকরিপ্রত্যাশীর আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল বেসরকারি খাত, সেখানেও বিরাজ করছে তীব্র খরা। দেশের অন্যতম বড় অনলাইন নিয়োগ পোর্টাল বিডিজবসের তথ্যভাণ্ডারে প্রায় ৭০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে দুই লাখের বেশি চাকরির আবেদন জমা পড়ছে, যা বাজারে কাজ খোঁজা মানুষের বিপুল চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। সংস্থাটি জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শ্রমবাজার আরও দুর্বল হয়েছে। শিল্প উৎপাদন হ্রাস, কর্মী ছাঁটাই ও কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় সেবা ও কৃষি খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে ঠেকেছে। শিল্প পুলিশের হিসাবমতে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরেই দেশে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ১৭০টিই ছিল তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে, যেখানে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়, যার সরাসরি আঘাত আসে তরুণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর।
এছাড়া কেবল চাকরির সংকটই নয়, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের দক্ষতার অমিল এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্যও সংকট বাড়াচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে চাকরির স্থায়িত্ব বা সামাজিক সুরক্ষার বালাই নেই। অন্যদিকে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচ বছরে এক কোটি (বছরে গড়ে ২০ লাখ) কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও চলতি অর্থবছরে নিট নতুন কাজ হতে পারে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার। অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত—প্রতিশ্রুতি বা কাগুজে পরিকল্পনা নয়; বরং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে বন্ধ কারখানা চালু এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলার বাস্তবমুখী পদক্ষেপই পারে এই রুদ্ধদ্বার খুলে দিতে।


























