মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন তার ‘দি অ্যানাটমি অব রেভোলিউশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর প্রতিটি বড় বিপ্লবের একটি ঝড়ের মতো গতিপথ থাকে— উত্তাপ, সংকট, তারপর উপশম। উপশমের কালেই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষা; কারণ তখন আবেগের জায়গা নেয় হিসাব-নিকাশ, ঐক্যের জায়গা নেয় ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা। ফরাসি চিন্তাবিদ টকভিল আরো আগেই সতর্ক করেছিলেন— জনপ্রত্যাশা যখন আকাশছোঁয়া আর প্রাপ্তি মাটিতে হামাগুড়ি দেয়, তখনই বিপ্লব সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে, ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আজ এই দুই তাত্ত্বিকের আয়নায় নিজেকে দেখতে হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের খতিয়ানে ইতিবাচক অর্জন যেমন সুবিশাল, নেতিবাচক উপসর্গও তেমনি উপেক্ষণীয় নয়। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব দুটোকেই নির্মোহভাবে বিচার করা।
বিচারের শুরুতেই পটভূমির দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল ভাবলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে। এর শিকড় প্রোথিত ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে— ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন, আয়নাঘর, ব্যাংক লুণ্ঠন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নির্লজ্জ দলীয়করণ এবং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে প্রজা ভাবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত করে, তখন রুশো-কথিত সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে এবং শাসনের নৈতিক বৈধতা লোপ পায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন ছিল সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গমাত্র। বিগত শাসকগোষ্ঠী শক্তির দম্ভে আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধসহ হাজারো তরুণের বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করল; সেই রক্তই আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তরিত করে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণে স্বৈরশাসনের যবনিকা টেনে দিল। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর ও নব্বইয়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশ হয়ে রইল নাগরিকের হৃত সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের আরেক মহাকাব্য।
এই মহাকাব্যের অর্জনগুলো এখন ইতিহাসের সম্পদ। জুলাইয়ের প্রথম ও প্রধান অর্জন— ভয়ের দেয়াল ভেঙে পড়া। যে জাতি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল, সে ফিরে পেল কণ্ঠস্বর। দ্বিতীয় অর্জন— তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণ; যাদের ‘রাজনীতিবিমুখ’ বলে তাচ্ছিল্য করা হতো, তারাই প্রমাণ করল ইতিহাসের চালিকাশক্তি তারাই। তৃতীয়ত, ‘বৈষম্যবিরোধিতা’ শব্দটি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত হলো— রাষ্ট্র মেরামতের এই পথে যাত্রা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















