সরকার এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত হওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য ইতিমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর পদত্যাগের পর সম্ভাব্য যোগ্য উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়েও দলটির নীতিনির্ধারণী উচ্চপর্যায়ে জোর আলোচনা ও রূপরেখা প্রস্তুত চলছে। রাষ্ট্রপতির কাছে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বার্তা পাঠানো সম্পর্কিত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে গতকাল বুধবার রাতে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক ওই সূত্র নিশ্চিত করেছেন যে, খুব শিগগিরই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে বঙ্গভবনকেন্দ্রিক একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নিজে ইতোমধ্যে তাঁর অধীনস্থ দপ্তর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিগগিরই বঙ্গভবন ছেড়ে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতার পর তিনি কিছুদিন পূর্ণ বিশ্রামে থাকবেন এবং উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশ সফরও করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে দেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি স্পিকারের উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করবেন। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট বিধানমতে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির সব দায়িত্ব পালন করবেন।
পরবর্তী সময় সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে এই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। যেহেতু বর্তমানে সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দলটির মনোনীত প্রার্থীই মূলত দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই দেশের পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে মনোনীত করা হবে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে নানামুখী হিসাব-নিকাশ চলছে। বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ সচিবের নাম সম্ভাব্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে হঠাৎ করেই আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি সুগভীর আস্থা—এসব বিবেচনা থেকেই মূলত তাঁর নাম সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের মত। যদিও এর আগে এই পদের জন্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খানসহ কয়েকজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতার নাম ব্যাপকভাবে চর্চায় ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি একেবারেই অবগত নই। আর এমন কিছু ঘটলে (রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ) শূন্য পদে অনেক নামই আলোচিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।’
অবশ্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বা ঘোষণা জারি করা হয়নি। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিবেচনা করছেন যে, নতুন রাষ্ট্রপতিকে পরবর্তী নির্বাচন ঘিরে সৃষ্টি হতে যাওয়া নানামুখী রাজনৈতিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। ফলে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দল ও সরকারের বাইরে সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর নিয়মিত পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন। পরবর্তীতে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা মিলে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়েছিলেন আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা। তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে সরানোর কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চললেও অবশেষে তিনি নিজেই পদত্যাগের প্রক্রিয়ার দিকে এগোচ্ছেন। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এটিই হবে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রদবদল।
রিপোর্টারের নাম 




















