ঢাকা ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

কৃষি নীতির অসংগতি দূর করে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ার তাগিদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১১:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কৃষিজমি ক্রমাগত কমলেও উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে কৃষির উন্নয়নে প্রণীত নীতিমালাগুলোর বাস্তবায়ন ও পারস্পরিক অসংগতি এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসংগতির কারণেই দেশে এখনো টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় সময় এসেছে নীতিমালাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে অ্যাগ্রোইকোলজি ও কৃষি খাদ্য ব্যবস্থাকে কৃষি নীতির অন্তর্ভুক্ত করার।

বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে “জাতীয় কৃষি নীতির বিভিন্ন দিক এবং কৃষি খাদ্য ব্যবস্থা: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ” শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে বক্তারা এ তাগিদ দেন। আয়োজক ছিল অ্যাগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশ, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থা ওয়েল্থহাঙ্গারহিলফে (ডব্লিউএইচএইচ)।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর কাদের। প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যাগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসীন আলী।

ডায়ালগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের গবেষণা পরিচালক আহমেদ বোরহান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি নীতি, সম্প্রসারণ নীতি ও জৈব কৃষি নীতিতে একদিকে টেকসই কৃষি ও পরিবেশবান্ধব চাষের কথা বলা হলেও অন্যদিকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা নীতিগত বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটি ও পানি দূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর কৃষকরা কীটনাশকের প্রভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। অপরদিকে, প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্ট ফুডের প্রবণতায় খাদ্যের পুষ্টি বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

বোরহান বলেন, কৃষি নীতিতে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে দুর্বল বাজার কাঠামো ও তথ্যপ্রবাহের অভাবে ক্ষুদ্র কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ পুনর্বিবেচনা করে নীতিগত দ্বৈততা পরিহার, এগ্রোইকোলজি ও কৃষি খাদ্য ব্যবস্থার কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা, জৈব সারে বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষক ও যুবদের সংগঠিত করার মাধ্যমে ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেচ, কোল্ড স্টোরেজে বিনিয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ জোরদারের সুপারিশ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “আমাদের দেশে কৃষি নিয়ে চিন্তা, সম্পদ ও উদ্যোগ থাকলেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এই সমন্বয়হীনতাই কৃষির উন্নয়নে বড় বাধা।” তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয় এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে— যার লক্ষ্য ২০৫০ সাল পর্যন্ত কৃষির টেকসই রূপান্তর।

তিনি আরও বলেন, “জনসংখ্যা বাড়ছে, জমি কমছে— এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমরা নতুন পরিকল্পনা সাজিয়েছি। ইতিমধ্যে ১৩টি থিমেটিক ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অ্যাগ্রোইকোলজির অনেক উপাদান অন্তর্ভুক্ত আছে।”

ডায়ালগে অন্যান্য বক্তারাও বলেন, কৃষিকে শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী খাত হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালায় একক ফসলের বদলে বহুমুখী উৎপাদন, জৈব কৃষি ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবশেষে বক্তারা বলেন, সরকার, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের সমন্বিত উদ্যোগেই টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আজ

কৃষি নীতির অসংগতি দূর করে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ার তাগিদ

আপডেট সময় : ০৮:১১:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫

পাঁচ দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের কৃষিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কৃষিজমি ক্রমাগত কমলেও উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে কৃষির উন্নয়নে প্রণীত নীতিমালাগুলোর বাস্তবায়ন ও পারস্পরিক অসংগতি এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অসংগতির কারণেই দেশে এখনো টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় সময় এসেছে নীতিমালাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে অ্যাগ্রোইকোলজি ও কৃষি খাদ্য ব্যবস্থাকে কৃষি নীতির অন্তর্ভুক্ত করার।

বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে “জাতীয় কৃষি নীতির বিভিন্ন দিক এবং কৃষি খাদ্য ব্যবস্থা: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ” শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে বক্তারা এ তাগিদ দেন। আয়োজক ছিল অ্যাগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশ, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও জার্মান উন্নয়ন সংস্থা ওয়েল্থহাঙ্গারহিলফে (ডব্লিউএইচএইচ)।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর কাদের। প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন। স্বাগত বক্তব্য দেন অ্যাগ্রোইকোলজি কোয়ালিশন বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসীন আলী।

ডায়ালগে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের গবেষণা পরিচালক আহমেদ বোরহান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি নীতি, সম্প্রসারণ নীতি ও জৈব কৃষি নীতিতে একদিকে টেকসই কৃষি ও পরিবেশবান্ধব চাষের কথা বলা হলেও অন্যদিকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা নীতিগত বৈপরীত্য সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটি ও পানি দূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খাদ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর কৃষকরা কীটনাশকের প্রভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। অপরদিকে, প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্ট ফুডের প্রবণতায় খাদ্যের পুষ্টি বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।

বোরহান বলেন, কৃষি নীতিতে কৃষকের ন্যায্য মূল্য, খাদ্যের সাশ্রয়ী মূল্য এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে দুর্বল বাজার কাঠামো ও তথ্যপ্রবাহের অভাবে ক্ষুদ্র কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ পুনর্বিবেচনা করে নীতিগত দ্বৈততা পরিহার, এগ্রোইকোলজি ও কৃষি খাদ্য ব্যবস্থার কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা, জৈব সারে বিনিয়োগ বাড়ানো, কৃষক ও যুবদের সংগঠিত করার মাধ্যমে ফার্মার প্রডিউসার কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেচ, কোল্ড স্টোরেজে বিনিয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ জোরদারের সুপারিশ করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “আমাদের দেশে কৃষি নিয়ে চিন্তা, সম্পদ ও উদ্যোগ থাকলেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এই সমন্বয়হীনতাই কৃষির উন্নয়নে বড় বাধা।” তিনি জানান, কৃষি মন্ত্রণালয় এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে— যার লক্ষ্য ২০৫০ সাল পর্যন্ত কৃষির টেকসই রূপান্তর।

তিনি আরও বলেন, “জনসংখ্যা বাড়ছে, জমি কমছে— এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমরা নতুন পরিকল্পনা সাজিয়েছি। ইতিমধ্যে ১৩টি থিমেটিক ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অ্যাগ্রোইকোলজির অনেক উপাদান অন্তর্ভুক্ত আছে।”

ডায়ালগে অন্যান্য বক্তারাও বলেন, কৃষিকে শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী খাত হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী খাত হিসেবে দেখতে হবে। নীতিমালায় একক ফসলের বদলে বহুমুখী উৎপাদন, জৈব কৃষি ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবশেষে বক্তারা বলেন, সরকার, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষকদের সমন্বিত উদ্যোগেই টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।