ঢাকা ১২:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চাইতে মরিয়া ট্রাম্প, তালেবান কী করবে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:১০:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪০ বার পড়া হয়েছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানের শাসক তালেবানের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে তারা যেন বাগরাম বিমানঘাঁটি ওয়াশিংটনের হাতে ফিরিয়ে দেয়। পাঁচ বছর আগে তিনিই তালেবানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করেছিলেন, যা কাবুল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম করেছিল।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার (বাগরাম) ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এটা (তালেবানের হাতে) কিছু না নিয়েই দিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা সেই ঘাঁটি ফেরত চাই।’ এর দুই দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি আরও সরাসরি হুমকি দেন, ‘যদি আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে, যারা বাগরাম বিমানঘাঁটি নির্মাণ করেছে, ফেরত না দেয়, তাহলে ভয়ানক কিছু ঘটতে যাচ্ছে!’

তালেবান ট্রাম্পের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এটাই প্রথম নয় যে ট্রাম্প বাগরাম ঘাঁটি ফেরত নেওয়ার আগ্রহ দেখালেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইট থেকে পরবর্তী সময়ে মুছে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘আমরা বাগরাম রাখতে চেয়েছিলাম। সেখানে একটি ছোট সেনাদল রাখতে চেয়েছিলাম।’

বাগরাম ঘাঁটি আসলে কী? কেন ট্রাম্প এটিকে এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন? এর কৌশলগত তাৎপর্য কী? আর যুক্তরাষ্ট্র কি এটি ফেরত পেতে সক্ষম?

বাগরাম বিমানঘাঁটি কী

মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের ঘাঁটি ছেড়ে আসার চার বছর পরও বাগরাম রয়ে গেছেন বিতর্কিত একটি জায়গা হিসেবে, যেটি আবার তালেবানের কাছ থেকে নিতে চাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এই ঘাঁটিতে দুটি কংক্রিট রানওয়ে রয়েছে—একটি ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার (২ দশমিক ২ মাইল) দীর্ঘ; অন্যটি ৩ কিলোমিটার (১ দশমিক ৯ মাইল)। কাবুল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে অবস্থিত ঘাঁটিটি গত অর্ধশতকে আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করা বিভিন্ন শক্তির জন্য ছিল এক কৌশলগত দুর্গ।

১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রথম এটি নির্মাণ করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর এক দশক তাদের দখলে থাকে ঘাঁটিটি। ১৯৯১ সালে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর নর্দান অ্যালায়েন্স এটা দখল করে, পরে আবার তালেবানের হাতে যায়। ২০০১ সালে ন্যাটো আগ্রাসনের পর ঘাঁটিটি মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০০৯ সালে ১০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় এর। মার্কিন সেনাদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেরিনসহ ন্যাটোর অন্য বাহিনীরাও এটি ব্যবহার করত।

এখানে একটি কুখ্যাত কারাগারও ছিল, যেখানে আফগান বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। ঘাঁটিতে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, সেনাদের থাকার ব্যারাক এবং এমনকি মার্কিন চেইন রেস্টুরেন্ট—পিৎজা হাট ও সাবওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল। ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সময় অস্ত্র-সরঞ্জামের বড় অংশ ধ্বংস করে ঘাঁটি খালি করে দেন। পরে স্থানীয় লোকজন অবশিষ্ট জিনিসপত্র লুট করেন এবং অবশেষে তালেবান সেটার দখল নেয়।

কেন ট্রাম্প বাগরাম ফেরত চান

ট্রাম্প প্রায়ই অভিযোগ করেছেন যে ২০২১ সালের তড়িঘড়ি করে সরে আসার সময় যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ফেলে গিয়েছিল, যা কার্যত তালেবান ও অন্যান্য গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের আগ্রহের মূল কারণ সেসব অস্ত্র নয়, বরং ঘাঁটির কৌশলগত ও প্রতীকী গুরুত্ব। ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস বলেন, ‘এটি সব সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন এটি নির্মাণ করেছিল।’

আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এর আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বড় আকারের সামরিক বিমান নামানোর মতো স্থান সেখানে খুবই সীমিত। বাগরাম আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি হিসেবে, সেই বিরল সুবিধা দেয়। কাবুলভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএনপিএস) নিরাপত্তা বিশ্লেষক হেকমতুল্লাহ আজামী বলেন, বাগরাম ঘাঁটিটি ২০০১ সালের পর ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে কুন্দুজে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস পরিচালিত হাসপাতালে বোমাবর্ষণের ঘটনাও রয়েছে, যেখানে ৪২ জন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মার্কিন বাহিনী স্বীকার করে এটি ছিল একটি ভুল।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতা: চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াত প্রার্থীর প্রার্থিতা আপিলেও বাতিল

বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চাইতে মরিয়া ট্রাম্প, তালেবান কী করবে

আপডেট সময় : ০১:১০:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানের শাসক তালেবানের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে তারা যেন বাগরাম বিমানঘাঁটি ওয়াশিংটনের হাতে ফিরিয়ে দেয়। পাঁচ বছর আগে তিনিই তালেবানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করেছিলেন, যা কাবুল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম করেছিল।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার (বাগরাম) ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এটা (তালেবানের হাতে) কিছু না নিয়েই দিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা সেই ঘাঁটি ফেরত চাই।’ এর দুই দিন পর ২০ সেপ্টেম্বর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি আরও সরাসরি হুমকি দেন, ‘যদি আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে, যারা বাগরাম বিমানঘাঁটি নির্মাণ করেছে, ফেরত না দেয়, তাহলে ভয়ানক কিছু ঘটতে যাচ্ছে!’

তালেবান ট্রাম্পের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এটাই প্রথম নয় যে ট্রাম্প বাগরাম ঘাঁটি ফেরত নেওয়ার আগ্রহ দেখালেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইট থেকে পরবর্তী সময়ে মুছে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘আমরা বাগরাম রাখতে চেয়েছিলাম। সেখানে একটি ছোট সেনাদল রাখতে চেয়েছিলাম।’

বাগরাম ঘাঁটি আসলে কী? কেন ট্রাম্প এটিকে এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছেন? এর কৌশলগত তাৎপর্য কী? আর যুক্তরাষ্ট্র কি এটি ফেরত পেতে সক্ষম?

বাগরাম বিমানঘাঁটি কী

মার্কিন সেনারা আফগানিস্তানের ঘাঁটি ছেড়ে আসার চার বছর পরও বাগরাম রয়ে গেছেন বিতর্কিত একটি জায়গা হিসেবে, যেটি আবার তালেবানের কাছ থেকে নিতে চাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এই ঘাঁটিতে দুটি কংক্রিট রানওয়ে রয়েছে—একটি ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার (২ দশমিক ২ মাইল) দীর্ঘ; অন্যটি ৩ কিলোমিটার (১ দশমিক ৯ মাইল)। কাবুল শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে অবস্থিত ঘাঁটিটি গত অর্ধশতকে আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণ করা বিভিন্ন শক্তির জন্য ছিল এক কৌশলগত দুর্গ।

১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রথম এটি নির্মাণ করে। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর এক দশক তাদের দখলে থাকে ঘাঁটিটি। ১৯৯১ সালে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর নর্দান অ্যালায়েন্স এটা দখল করে, পরে আবার তালেবানের হাতে যায়। ২০০১ সালে ন্যাটো আগ্রাসনের পর ঘাঁটিটি মার্কিন সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০০৯ সালে ১০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় এর। মার্কিন সেনাদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মেরিনসহ ন্যাটোর অন্য বাহিনীরাও এটি ব্যবহার করত।

এখানে একটি কুখ্যাত কারাগারও ছিল, যেখানে আফগান বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। ঘাঁটিতে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, সেনাদের থাকার ব্যারাক এবং এমনকি মার্কিন চেইন রেস্টুরেন্ট—পিৎজা হাট ও সাবওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল। ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান থেকে সরে আসার সময় অস্ত্র-সরঞ্জামের বড় অংশ ধ্বংস করে ঘাঁটি খালি করে দেন। পরে স্থানীয় লোকজন অবশিষ্ট জিনিসপত্র লুট করেন এবং অবশেষে তালেবান সেটার দখল নেয়।

কেন ট্রাম্প বাগরাম ফেরত চান

ট্রাম্প প্রায়ই অভিযোগ করেছেন যে ২০২১ সালের তড়িঘড়ি করে সরে আসার সময় যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ফেলে গিয়েছিল, যা কার্যত তালেবান ও অন্যান্য গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের আগ্রহের মূল কারণ সেসব অস্ত্র নয়, বরং ঘাঁটির কৌশলগত ও প্রতীকী গুরুত্ব। ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক ইব্রাহিম বাহিস বলেন, ‘এটি সব সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেহেতু সোভিয়েত ইউনিয়ন এটি নির্মাণ করেছিল।’

আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে এর আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বড় আকারের সামরিক বিমান নামানোর মতো স্থান সেখানে খুবই সীমিত। বাগরাম আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি হিসেবে, সেই বিরল সুবিধা দেয়। কাবুলভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড পিস স্টাডিজের (সিএনপিএস) নিরাপত্তা বিশ্লেষক হেকমতুল্লাহ আজামী বলেন, বাগরাম ঘাঁটিটি ২০০১ সালের পর ওয়াশিংটনের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করেছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে কুন্দুজে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস পরিচালিত হাসপাতালে বোমাবর্ষণের ঘটনাও রয়েছে, যেখানে ৪২ জন নিহত ও অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে মার্কিন বাহিনী স্বীকার করে এটি ছিল একটি ভুল।