ঢাকা ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ কেনার কৌশলগত গুরুত্ব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তার বিমানবাহিনীকে আধুনিক করার জন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার অধীনে দ্রুত গতিতে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চালাচ্ছে। এই বিমান চীনের চেঙ্গদু এফসি-১ এবং পাকিস্তান অ্যারনোটিক্যাল কমপ্লেক্স যৌথভাবে তৈরি করে। এটি মাল্টিরোল ফাইটার, যা আকাশ যুদ্ধ, গ্রাউন্ড অ্যাটাক, রেকনেসাঁস এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কাজ করতে পারে। বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ১ দশমিক ৬ ম্যাক (১৯১০ কিমি/ঘণ্টা), রেঞ্জ ৩০০০ কিমি এবং অস্ত্র বহন ক্ষমতা ৪০০০ কেজি।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের এয়ার চিফ মার্শাল জাহিদ মাহমুদ এবং বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান ইসলামাবাদে মিলিত হয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) বলেছে যে বাংলাদেশ ‘সম্ভাব্য আগ্রহ’ দেখিয়েছে জেএফ-১৭ কেনার এবং এতে প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশ সম্ভাব্য ৪৮টি জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে বর্তমানে ৪৪টি যুদ্ধবিমান আছে; যার মধ্যে আটটি মিগ-২৯ এবং ৩৬টি চায়নিজ হালকা ইন্টারসেপ্টর চেঙ্গদু এফ-৭ যুদ্ধবিমান। এগুলোর অনেকগুলো পুরোনো, তাই নতুন বিমান দরকার। যুদ্ধবিমানগুলোর অপারেশনাল রাখতে রক্ষণাবেক্ষণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সমস্যা আছে, বিশেষ করে চীনা যুদ্ধবিমানে। ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্সে বিএএফ ৫৭তম স্থানে (২০২৬), কিন্তু যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়ালে র‌্যাংক উন্নত হবে। এই কেনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর অধীনে বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের জন্য জেএফ-১৭ কেনার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে, যা অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে উপকারী হবে।

অর্থনৈতিকভাবে জেএফ-১৭ সস্তা এবং খরচ-কার্যকর। প্রতিটি জেএফ-১৭-এর দাম ২৫-৩২ মিলিয়ন ডলার, যা অন্যান্য যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম। যেখানে ইউরো ফাইটার টাইফুনের গড় দাম ১১৭ মিলিয়ন ডলার, রাফায়েলের দাম ৭৪-১২৫ মিলিয়ন ডলার, সু ৩০ এবং সু- ৩৫-এর দাম ৫০-৮০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সীমিত বাজেটে জেএফ-১৭ হবে আদর্শ। এ ছাড়া, বিমানটির ফ্লাইট প্রতি ঘণ্টার খরচ মাত্র ৬০০০ ডলার, যা অন্যান্য বিমানের তুলনায় কম। যেমন : রাফায়েল ১৬০০০ ডলার, যা দীর্ঘমেয়াদি খরচকে আয়ত্তের মধ্যে রাখবে।

প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ ব্লক-৩ মডেলটি খুবই আধুনিক এবং শক্তিশালী প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এতে রয়েছে অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, যা দূর থেকে শত্রু শনাক্ত করতে সাহায্য করে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সিস্টেম, যা শত্রুর ইলেকট্রনিক সিগন্যাল জ্যাম করে এবং পিএল-১৫-এর মতো এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল, যা আকাশ থেকে শত্রু বিমানকে ধ্বংস করে। এই যুদ্ধবিমান কেনা হলে বাংলাদেশের পুরোনো বিমানগুলোর পরিবর্তে এটি ব্যবহার করে বিমানবাহিনীকে আরো শক্তিশালী এবং আধুনিক করা যাবে। এই বিমানটি বাংলাদেশের বর্তমান অন্যান্য চীনা সিস্টেমের সঙ্গে কম্প্যাটিবল, তাই পুরো সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন সহজতর। পাকিস্তান, মিয়ানমার এবং নাইজেরিয়ায়, আজারবাইজান, লিবিয়ায় ২১০ এর বেশি এই বিমান সফলভাবে ব্যবহার হচ্ছে, যা তার নির্ভরযোগ্যতা এবং কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। সৌদি আরব এই বিমান ক্রয়ে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করতে যাচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে।

কৌশলগতভাবে এই ক্রয় বাংলাদেশকে চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে কাছাকাছি করবে, যা ভারত-চীন টেনশনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ ২০১৭ সালের যৌথ চুক্তির মাধ্যমে ইতোমধ্যে পাকিস্তান থেকে প্রতিরক্ষা সহায়তা নেয় আর এই ক্রয় সেই সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। এছাড়া এটি মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশীদের মোকাবিলায় সাহায্য করবে, যারা জেএফ-১৭ ব্যবহার করে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ১৬টি জেএফ-১৭ আছে। এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার একটি উপায়।

পাকিস্তান বাংলাদেশের নৈকট্যের কারণে, যা সমুদ্রপথে মাত্র ২০০০ কিলোমিটার। এতে লজিস্টিকস সহজ হবে। খুচরা যন্ত্রাংশ দ্রুত আসবে, যা চীন থেকে কেনার চেয়ে সস্তা এবং সহজ। যেখানে চীন থেকে শিপিং চার-ছয় সপ্তাহ লাগে, সেখানে পাকিস্তান থেকে মাত্র দু-এক সপ্তাহ। পাকিস্তানের কামরা অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমানগুলো তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সাপোর্ট দিতে পারবে। এতে মেইনটেন্যান্সের খরচ প্রতি ঘণ্টা ৬০০০ ডলার ধারণা করা হচ্ছে, যা অন্যান্য যুদ্ধবিমানের চেয়ে কম এবং দ্রুত যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াবে।

প্রশিক্ষণের দিক থেকে বড় আকারের সুবিধা হচ্ছে পাকিস্তান এই বিমানের প্রধান ব্যবহারকারী (১৫০ এর বেশি বিমান), তাই তারা সহজেই প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। বাংলাদেশের পাইলটদের পাকিস্তানে পাঠানো যাবে, যা সস্তা এবং কার্যকর হবে। প্যাকেজ ক্রয়ে সিমুলেটর এবং রিয়েল-টাইম প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত, যা বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর দক্ষতা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে ৬-১২ মাসের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা চীনের চেয়ে সহজ কারণ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক মিল আছে।

খুচরা যন্ত্রাংশ এবং মেইনটেন্যান্সে জেএফ-১৭-এর খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা, কারণ পাকিস্তান নিজেই কামরা কমপ্লেক্সে ৮০ শতাংশ লোকাল প্রোডাকশন করে। বাংলাদেশের চীনা অস্ত্রে খুচরা যন্ত্রাংশের সমস্যা আছে; এফ-৭ এবং কে-৮ ডব্লিউতে ত্রুটি আছে, যাতে ৩০ শতাংশ অস্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে, কিন্তু পাকিস্তানের নৈকট্যের কারণে দ্রুত সরবরাহ হবে। রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে কারণ বিমানটির ডিজাইন সিম্পল এবং লো-মেইনটেন্যান্স। যেমন : প্রতি ১০০ ঘণ্টা ফ্লাইটে ১৫ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণ দরকার, যা এফ-১৬-এর চেয়ে কম। পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট যেমন : ১০-১৫ বছরের ওয়ারেন্টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা চীনের চেয়ে নির্ভরযোগ্য হবে।

ভারত এই সম্ভাব্য ক্রয়ের চুক্তির খবরে উদ্বিগ্ন, কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব উন্নয়নকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে’।

ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী জেএফ-১৭-কে ‘প্রমাণিত যুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম’ বলে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য কেনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ডিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়লে। ভারতের উদ্বেগের কারণ : জেএফ-১৭ চীন-পাকিস্তানের যৌথ প্রকল্প এবং ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে জড়িত। এছাড়া, ১৯৭১-এর যুদ্ধের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নত হলে ভারতের কৌশলগত সুবিধা কমতে পারে। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বাণিজ্যে চাপে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশের আকাশকে শত্রুমুক্ত রাখতে বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। এখন শুধু নির্ভরযোগ্য অংশীদারের সঙ্গে সঠিক চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে চলেছেÑযেমন : ভারতের রাফায়েল এবং এফ-১৬ ফিল্টার বিস্তার, বা মিয়ানমারের জেএফ-১৭ এবং সু-৩০-এর শক্তিশালী সংগ্রহÑতখন নিজেদের পিছিয়ে রাখা শুধু আত্মঘাতীই নয়, বরং স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বকেও বিপন্ন করে তোলে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শহীদের রক্তদানের সেই অমর আত্মত্যাগকে অক্ষুণ্ণ রাখতে, নিজেদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে অটুট রাখতে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অত্যাধুনিক করে তোলা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এজন্য প্রতিবেশীদের যেকোনো অযাচিত উদ্বেগ বা মনঃক্ষুণ্ণতাকে কূটনৈতিকভাবে এবং কৌশলগত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে, যাতে আমাদের স্বাধীনতার আকাশ সদা উজ্জ্বল এবং সুরক্ষিত থাকে।

লেখক : আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিশ্লেষক

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঝিনাইদহে বাড়ি নির্মাণের জন্য মাটি খুঁড়তেই মিলল দুটি হ্যান্ড গ্রেনেড

পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ কেনার কৌশলগত গুরুত্ব

আপডেট সময় : ০৯:৩২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তার বিমানবাহিনীকে আধুনিক করার জন্য ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ পরিকল্পনার অধীনে দ্রুত গতিতে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চালাচ্ছে। এই বিমান চীনের চেঙ্গদু এফসি-১ এবং পাকিস্তান অ্যারনোটিক্যাল কমপ্লেক্স যৌথভাবে তৈরি করে। এটি মাল্টিরোল ফাইটার, যা আকাশ যুদ্ধ, গ্রাউন্ড অ্যাটাক, রেকনেসাঁস এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কাজ করতে পারে। বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ১ দশমিক ৬ ম্যাক (১৯১০ কিমি/ঘণ্টা), রেঞ্জ ৩০০০ কিমি এবং অস্ত্র বহন ক্ষমতা ৪০০০ কেজি।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের এয়ার চিফ মার্শাল জাহিদ মাহমুদ এবং বাংলাদেশের এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আবদুল হান্নান ইসলামাবাদে মিলিত হয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) বলেছে যে বাংলাদেশ ‘সম্ভাব্য আগ্রহ’ দেখিয়েছে জেএফ-১৭ কেনার এবং এতে প্রতিরক্ষা চুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশ সম্ভাব্য ৪৮টি জেএফ-১৭ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বিমানবাহিনীতে বর্তমানে ৪৪টি যুদ্ধবিমান আছে; যার মধ্যে আটটি মিগ-২৯ এবং ৩৬টি চায়নিজ হালকা ইন্টারসেপ্টর চেঙ্গদু এফ-৭ যুদ্ধবিমান। এগুলোর অনেকগুলো পুরোনো, তাই নতুন বিমান দরকার। যুদ্ধবিমানগুলোর অপারেশনাল রাখতে রক্ষণাবেক্ষণ এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সমস্যা আছে, বিশেষ করে চীনা যুদ্ধবিমানে। ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্সে বিএএফ ৫৭তম স্থানে (২০২৬), কিন্তু যুদ্ধবিমানের সংখ্যা বাড়ালে র‌্যাংক উন্নত হবে। এই কেনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর অধীনে বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের জন্য জেএফ-১৭ কেনার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে, যা অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে উপকারী হবে।

অর্থনৈতিকভাবে জেএফ-১৭ সস্তা এবং খরচ-কার্যকর। প্রতিটি জেএফ-১৭-এর দাম ২৫-৩২ মিলিয়ন ডলার, যা অন্যান্য যুদ্ধবিমানের তুলনায় অনেক কম। যেখানে ইউরো ফাইটার টাইফুনের গড় দাম ১১৭ মিলিয়ন ডলার, রাফায়েলের দাম ৭৪-১২৫ মিলিয়ন ডলার, সু ৩০ এবং সু- ৩৫-এর দাম ৫০-৮০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সীমিত বাজেটে জেএফ-১৭ হবে আদর্শ। এ ছাড়া, বিমানটির ফ্লাইট প্রতি ঘণ্টার খরচ মাত্র ৬০০০ ডলার, যা অন্যান্য বিমানের তুলনায় কম। যেমন : রাফায়েল ১৬০০০ ডলার, যা দীর্ঘমেয়াদি খরচকে আয়ত্তের মধ্যে রাখবে।

প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ ব্লক-৩ মডেলটি খুবই আধুনিক এবং শক্তিশালী প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এতে রয়েছে অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, যা দূর থেকে শত্রু শনাক্ত করতে সাহায্য করে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সিস্টেম, যা শত্রুর ইলেকট্রনিক সিগন্যাল জ্যাম করে এবং পিএল-১৫-এর মতো এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল, যা আকাশ থেকে শত্রু বিমানকে ধ্বংস করে। এই যুদ্ধবিমান কেনা হলে বাংলাদেশের পুরোনো বিমানগুলোর পরিবর্তে এটি ব্যবহার করে বিমানবাহিনীকে আরো শক্তিশালী এবং আধুনিক করা যাবে। এই বিমানটি বাংলাদেশের বর্তমান অন্যান্য চীনা সিস্টেমের সঙ্গে কম্প্যাটিবল, তাই পুরো সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন সহজতর। পাকিস্তান, মিয়ানমার এবং নাইজেরিয়ায়, আজারবাইজান, লিবিয়ায় ২১০ এর বেশি এই বিমান সফলভাবে ব্যবহার হচ্ছে, যা তার নির্ভরযোগ্যতা এবং কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। সৌদি আরব এই বিমান ক্রয়ে বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করতে যাচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে।

কৌশলগতভাবে এই ক্রয় বাংলাদেশকে চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে কাছাকাছি করবে, যা ভারত-চীন টেনশনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ ২০১৭ সালের যৌথ চুক্তির মাধ্যমে ইতোমধ্যে পাকিস্তান থেকে প্রতিরক্ষা সহায়তা নেয় আর এই ক্রয় সেই সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে। এছাড়া এটি মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশীদের মোকাবিলায় সাহায্য করবে, যারা জেএফ-১৭ ব্যবহার করে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ১৬টি জেএফ-১৭ আছে। এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার একটি উপায়।

পাকিস্তান বাংলাদেশের নৈকট্যের কারণে, যা সমুদ্রপথে মাত্র ২০০০ কিলোমিটার। এতে লজিস্টিকস সহজ হবে। খুচরা যন্ত্রাংশ দ্রুত আসবে, যা চীন থেকে কেনার চেয়ে সস্তা এবং সহজ। যেখানে চীন থেকে শিপিং চার-ছয় সপ্তাহ লাগে, সেখানে পাকিস্তান থেকে মাত্র দু-এক সপ্তাহ। পাকিস্তানের কামরা অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমানগুলো তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সাপোর্ট দিতে পারবে। এতে মেইনটেন্যান্সের খরচ প্রতি ঘণ্টা ৬০০০ ডলার ধারণা করা হচ্ছে, যা অন্যান্য যুদ্ধবিমানের চেয়ে কম এবং দ্রুত যুদ্ধ প্রস্তুতি বাড়াবে।

প্রশিক্ষণের দিক থেকে বড় আকারের সুবিধা হচ্ছে পাকিস্তান এই বিমানের প্রধান ব্যবহারকারী (১৫০ এর বেশি বিমান), তাই তারা সহজেই প্রশিক্ষণ দিতে পারবে। বাংলাদেশের পাইলটদের পাকিস্তানে পাঠানো যাবে, যা সস্তা এবং কার্যকর হবে। প্যাকেজ ক্রয়ে সিমুলেটর এবং রিয়েল-টাইম প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত, যা বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর দক্ষতা বাড়াবে। পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে ৬-১২ মাসের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা চীনের চেয়ে সহজ কারণ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ভাষা এবং সাংস্কৃতিক মিল আছে।

খুচরা যন্ত্রাংশ এবং মেইনটেন্যান্সে জেএফ-১৭-এর খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা, কারণ পাকিস্তান নিজেই কামরা কমপ্লেক্সে ৮০ শতাংশ লোকাল প্রোডাকশন করে। বাংলাদেশের চীনা অস্ত্রে খুচরা যন্ত্রাংশের সমস্যা আছে; এফ-৭ এবং কে-৮ ডব্লিউতে ত্রুটি আছে, যাতে ৩০ শতাংশ অস্ত্র অকার্যকর হয়ে পড়ে, কিন্তু পাকিস্তানের নৈকট্যের কারণে দ্রুত সরবরাহ হবে। রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে কারণ বিমানটির ডিজাইন সিম্পল এবং লো-মেইনটেন্যান্স। যেমন : প্রতি ১০০ ঘণ্টা ফ্লাইটে ১৫ ঘণ্টা রক্ষণাবেক্ষণ দরকার, যা এফ-১৬-এর চেয়ে কম। পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট যেমন : ১০-১৫ বছরের ওয়ারেন্টি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা চীনের চেয়ে নির্ভরযোগ্য হবে।

ভারত এই সম্ভাব্য ক্রয়ের চুক্তির খবরে উদ্বিগ্ন, কারণ এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে, তারা ‘জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব উন্নয়নকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে’।

ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী জেএফ-১৭-কে ‘প্রমাণিত যুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম’ বলে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য কেনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ডিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়লে। ভারতের উদ্বেগের কারণ : জেএফ-১৭ চীন-পাকিস্তানের যৌথ প্রকল্প এবং ভারত চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে জড়িত। এছাড়া, ১৯৭১-এর যুদ্ধের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নত হলে ভারতের কৌশলগত সুবিধা কমতে পারে। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বাণিজ্যে চাপে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশের আকাশকে শত্রুমুক্ত রাখতে বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণের সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। এখন শুধু নির্ভরযোগ্য অংশীদারের সঙ্গে সঠিক চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে চলেছেÑযেমন : ভারতের রাফায়েল এবং এফ-১৬ ফিল্টার বিস্তার, বা মিয়ানমারের জেএফ-১৭ এবং সু-৩০-এর শক্তিশালী সংগ্রহÑতখন নিজেদের পিছিয়ে রাখা শুধু আত্মঘাতীই নয়, বরং স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বকেও বিপন্ন করে তোলে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শহীদের রক্তদানের সেই অমর আত্মত্যাগকে অক্ষুণ্ণ রাখতে, নিজেদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বকে অটুট রাখতে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অত্যাধুনিক করে তোলা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এজন্য প্রতিবেশীদের যেকোনো অযাচিত উদ্বেগ বা মনঃক্ষুণ্ণতাকে কূটনৈতিকভাবে এবং কৌশলগত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে, যাতে আমাদের স্বাধীনতার আকাশ সদা উজ্জ্বল এবং সুরক্ষিত থাকে।

লেখক : আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিশ্লেষক