ময়মনসিংহের ভালুকায় হিন্দু যুবক দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কতিপয় নেতার উসকানিমূলক ও আগ্রাসী মন্তব্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। যদিও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছে এবং বাকি আসামিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে, তথাপি একটি অভ্যন্তরীণ অপরাধকে ঘিরে ভারতের পক্ষ থেকে এমন অপরিণামদর্শী বক্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিজেপি নেতা ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যেখানে তিনি ইসরাইলের গাজা আগ্রাসনকে উদাহরণ টেনে বাংলাদেশকে ‘সবক শেখানোর’ হুমকি দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যকে কেবল একটি অসতর্ক রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে না, বরং ভারতের রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উগ্র মানসিকতার এক বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে একটি চলমান মানবিক বিপর্যয় ও গণহত্যাকে ‘শিক্ষণীয় মডেল’ হিসেবে উপস্থাপন করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। এর আগে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাও বাংলাদেশের সংকট সমাধানে ‘সার্জিক্যাল অ্যাটাক’-এর মতো সামরিক ভাষা ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে সামরিক শক্তির মাপকাঠিতে বিচার করার প্রবণতা স্পষ্ট করে। ভারতের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নিম্নবর্ণের দলিত শ্রেণির মানুষ অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের একটি অভ্যন্তরীণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন আগ্রাসী ভূমিকা দ্বিচারিতার নামান্তর।
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় আজ বিশ্ববিবেকের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্ন। হাজার হাজার শিশু, নারী ও বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, নির্বিচার বোমাবর্ষণ এবং মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী গুরুতর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এমন ধ্বংসযজ্ঞকে ‘অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত’ হিসেবে হাজির করা কেবল উগ্র জাতীয়তাবাদ নয়, বরং সহিংসতাকে নৈতিক বৈধতা দেওয়ার এক ভয়ংকর প্রচেষ্টা। এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে, বরং ‘শাস্তিযোগ্য ভূখণ্ড’ বা ‘শিক্ষা পাওয়ার যোগ্য শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
এই নেতাদের বক্তব্য ভারতের শাসকগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে সমান মর্যাদার অংশীদার হিসেবে না দেখে, বরং সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট করে। এই মানসিকতা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় চরিত্রের জন্যও গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। যখন উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে বিদেশনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্যও ভেঙে পড়ে। ‘একশ কোটি হিন্দুর দেশ’ ও ‘হিন্দু হিত’-এর মতো বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একমাত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের ঐক্য ও স্থিতিশীলতাকেই বিপন্ন করবে।
তবে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা। শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্যের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষোভ সৃষ্টি হলেও, তা মূলত বিরোধী দলগুলোর আনুষ্ঠানিক নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই বক্তব্যকে ‘নগ্ন ঘৃণামূলক ভাষণ’ ও ‘গণহত্যার আহ্বান’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, প্রবীণ আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা কপিল সিব্বল প্রশ্ন তুলেছেন, এমন স্পষ্ট উসকানিমূলক বক্তব্যের পরও কেন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্ন ভারতের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর গভীর ছায়া ফেলেছে, কারণ অতীতে দেখা গেছে, ভারতের কোনো মুসলিম বা সংখ্যালঘু নেতা সামান্য সমালোচনামূলক মন্তব্য করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র কঠোর আইন প্রয়োগে দ্বিধা করে না। অথচ প্রতিবেশী দেশে গণহত্যার ইঙ্গিতপূর্ণ হুমকি দেওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় নীরবতা অনেকের কাছে ‘মৌন সম্মতি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নীরবতার সামাজিক প্রতিফলন আরও ভয়াবহ। ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে ধারাবাহিক সহিংসতা ও নিপীড়নের চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা মূলত এই উগ্র রাজনৈতিক ভাষারই বাস্তব রূপ। ‘বাংলাদেশি’, ‘রোহিঙ্গা’, ‘লাভ জিহাদ’ ইত্যাদি শব্দগুলো আজ ভারতে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এগুলো কার্যত সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে বিহার, আসাম থেকে ওড়িশা পর্যন্ত বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে হেনস্তা, গ্রেপ্তার বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের ১৯ বছর বয়সী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল রানাকে পিটিয়ে হত্যা কিংবা আসামের শিলচরে রিঙ্কু শেখের ওপর হামলা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উগ্র বয়ানেরই অশুভ ফল। আইনগত বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও এই মানুষগুলো কেন রক্ষা পাচ্ছেন না, তার উত্তর রাষ্ট্রীয় ভাষাতেই নিহিত। যখন মুখ্যমন্ত্রী বা প্রভাবশালী নেতারা প্রকাশ্যে ‘সবক শেখানো’ বা ‘সার্জিক্যাল অ্যাটাক’-এর কথা বলেন, তখন মাঠপর্যায়ের উগ্রপন্থীরা সেই ভাষাকেই সহিংসতার লাইসেন্স হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে বিচারহীনতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় কারো বেঁচে থাকা বা মরার প্রধান নির্ধারকে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে গাজার উদাহরণ টানা বিশেষভাবে নিন্দনীয়। ইসরাইল যেমন ‘আত্মরক্ষা’র অজুহাতে একটি জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে, ঠিক তেমনি ভারতের উগ্রবাদী রাজনীতিও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘হিন্দু সুরক্ষা’র নামে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক শান্তিকে বিপন্ন করছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), এনআরসি, ওয়াকফ সংশোধন বিল এবং তথাকথিত ‘বুলডোজার রাজনীতি’—এসব মিলে ভারতে মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া দৃশ্যমান। এই প্রক্রিয়া কেবল মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও এর শিকার হচ্ছে। বড়দিন উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা বা উৎসব ব্যাহত হওয়ার ঘটনাগুলো এই অসহিষ্ণুতার নগ্ন প্রমাণ। কেরালার পালাক্কাড় জেলায় শিশুদের ক্যারল গান গাওয়ার সময় হামলা, উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হওয়া কিংবা দিল্লির লাজপত নগরে নারী ও শিশুদের হুমকির ঘটনাগুলো কোনো আকস্মিক প্রবণতা নয়, বরং একটি ক্রমবর্ধমান কাঠামোগত সহিংসতার ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে এক বড় সতর্কবার্তা। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও অর্থনীতির সুতোয় গাঁথা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আজ এক জটিল মোড়ের মুখে। এই সম্পর্ককে যদি সংকীর্ণ নির্বাচনী রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িক আবেগের হাতিয়ার বানানো হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উভয় দেশের জনগণের ওপর। কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনো ব্যক্তিগত হুমকি বা উগ্র স্লোগানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে না; এটি পরিচালিত হয় আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ভিত্তিতে। শুভেন্দু অধিকারী বা হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো নেতাদের আগ্রাসী ভাষা ভারতের ঘোষিত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গাজার মতো পরিস্থিতির হুমকি দেওয়া মানে গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে এক স্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া। এই অঞ্চলের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সামরিক আগ্রাসন বা উগ্র জাতীয়তাবাদ কখনো টেকসই শান্তি আনতে পারেনি; বরং এটি দারিদ্র্য, শরণার্থী সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতার জন্ম দিয়েছে। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, সচেতন বিশ্বসমাজ এবং ভারতের অভ্যন্তরে থাকা প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো এই বিষাক্ত ভাষাকে স্বাভাবিক হতে না দেওয়া।
পরিশেষে, এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, বরং চরম মানবিক ও নৈতিকতার প্রশ্ন। কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক শক্তি কি কখনো গণহত্যাকে তার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে? ইতিহাস সাক্ষী, ফ্যাসিবাদ সবসময় ভাষাগত আগ্রাসনের মাধ্যমেই তার যাত্রা শুরু করে। প্রথমে ভাষায়, তারপর আইনে এবং শেষে অস্ত্রের প্রয়োগে। এই ঘৃণার রাজনীতিকে এখনই থামানো না গেলে এর পরিণতি কেবল বাংলাদেশ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য নয়, এটি ভারতের নিজস্ব গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও ভেঙে দেবে। ঘৃণা কখনো শান্তি আনে না, এটি কেবল আরও ঘৃণা ও ধ্বংসের জন্ম দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত সহাবস্থান, সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে, কোনো আগ্রাসী মডেলের অনুকরণে নয়।
রিপোর্টারের নাম 

























