ঢাকা ০২:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই আন্দোলনে প্রথম সারিতে থাকলেও সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্বে দলগুলোর অঙ্গীকার ভঙ্গ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:২০:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে নারীরা সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের নতুন আইনসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিফলন অত্যন্ত নগণ্য। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সই করে অঙ্গীকার করেছিল যে, প্রতিটি দল ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দলই সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এই ঘটনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর এই অঙ্গীকার ভঙ্গ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে শতাধিক নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, যার মধ্যে বাছাই প্রক্রিয়ায় টিকে আছেন মাত্র ৬৫ জনের মতো। ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও কমতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়ে শীর্ষে থাকলেও, শতাংশের হিসেবে তারা নির্ধারিত ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে, নতুন নিবন্ধিত দল ‘বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী)’ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; তারা তাদের মোট প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারী মনোনয়ন দিয়েছে। তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দল—যাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মতো বড় দলগুলোও রয়েছে—একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।

নারী অধিকার কর্মীরা এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নারীর নেতৃত্বকে সামনে আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর এই স্থবিরতা অত্যন্ত দুঃখজনক। মনোনয়নের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই ভাবছে না।” নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, দেশের অর্ধেক ভোটার নারী হওয়া সত্ত্বেও আড়াই হাজার মনোনয়নের মধ্যে মাত্র শতাধিক নারী হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। উল্লেখ্য যে, জুলাই সনদে বলা হয়েছিল—সংসদে ৩৩ শতাংশ বা ১০০ আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতি নির্বাচনে ৫ শতাংশ হারে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৩৯ জন নারী প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন, যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৮ সালে ৬৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯৪ জনে দাঁড়িয়েছিল। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারীর সংখ্যাও গত নির্বাচনে রেকর্ড ২২ জনে পৌঁছেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে দলগুলোর অনীহা সেই অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরাসরি নির্বাচনের বাইরে বর্তমানে সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও, নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্পষ্ট হবে যে, শেষ পর্যন্ত কতজন নারী ভোটের ময়দানে লড়াইয়ে থাকছেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

জুলাই আন্দোলনে প্রথম সারিতে থাকলেও সংসদ নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্বে দলগুলোর অঙ্গীকার ভঙ্গ

আপডেট সময় : ০১:২০:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজপথে নারীরা সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের নতুন আইনসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিফলন অত্যন্ত নগণ্য। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সই করে অঙ্গীকার করেছিল যে, প্রতিটি দল ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দলই সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এই ঘটনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর এই অঙ্গীকার ভঙ্গ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে শতাধিক নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, যার মধ্যে বাছাই প্রক্রিয়ায় টিকে আছেন মাত্র ৬৫ জনের মতো। ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও কমতে পারে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়ে শীর্ষে থাকলেও, শতাংশের হিসেবে তারা নির্ধারিত ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছে। অন্যদিকে, নতুন নিবন্ধিত দল ‘বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ-মার্কসবাদী)’ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; তারা তাদের মোট প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারী মনোনয়ন দিয়েছে। তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫১টি দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দল—যাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মতো বড় দলগুলোও রয়েছে—একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি।

নারী অধিকার কর্মীরা এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, “নারীর নেতৃত্বকে সামনে আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর এই স্থবিরতা অত্যন্ত দুঃখজনক। মনোনয়নের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই ভাবছে না।” নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, দেশের অর্ধেক ভোটার নারী হওয়া সত্ত্বেও আড়াই হাজার মনোনয়নের মধ্যে মাত্র শতাধিক নারী হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। উল্লেখ্য যে, জুলাই সনদে বলা হয়েছিল—সংসদে ৩৩ শতাংশ বা ১০০ আসনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতি নির্বাচনে ৫ শতাংশ হারে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানো হবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৩৯ জন নারী প্রার্থী অংশ নিয়েছিলেন, যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৮ সালে ৬৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯৪ জনে দাঁড়িয়েছিল। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারীর সংখ্যাও গত নির্বাচনে রেকর্ড ২২ জনে পৌঁছেছিল। তবে এবারের নির্বাচনে দলগুলোর অনীহা সেই অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরাসরি নির্বাচনের বাইরে বর্তমানে সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও, নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্পষ্ট হবে যে, শেষ পর্যন্ত কতজন নারী ভোটের ময়দানে লড়াইয়ে থাকছেন।