ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

‘বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না’

যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮)। জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারান এই ব্যবসায়ী। পরিচয় না পাওয়ায় তাকে দাফন করা হয় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে। দাফনের দীর্ঘ দেড় বছর পর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে সোহেলের। অবশেষে তার কবর বুঝে পেয়েছে স্বজনেরা। 

কবর বুঝে পাওয়ার পরই কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহেলের মা রাশেদা বেগম। ছেলের নানা স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।” 

সোমবার (৫ জানুয়ারি) সোহেল ছাড়াও আরও সাতজনের কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাদের স্বজনদের। এ সময় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। 

দীর্ঘ এক মাসের চেষ্টায় ডিএনএ’র মাধ্যমে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা এই আটজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনরা প্রিয় সন্তানের কবর বুঝে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের কবর পেয়ে কাউকে পানি দিতে দেখা যায়। আবার কাউকে মাটি ছুঁয়ে, কাউকে কবরে লাগানো গাছে হাত বুলাতেও দেখা যায়। 

সোহেল রানা ছাড়াও পরিচয় শনাক্ত হওয়ারা হলেন— মাদারটেক এলাকায় প্রাণ হারানো কাবিল হোসেন (৫৮), উত্তরায় নিহত আসাদুল্লাহ (৩১), রফিকুল ইসলাম (৫২) ও ফয়সাল সরকার (২৬), বাড্ডায় নিহত পারভেজ ব্যাপারী (২৩), যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত রফিকুল ইসলাম (২৯) এবং মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিম (৩২)। 

এর আগে সিআইডির উদ্যোগে জুলাই আন্দোল‌নে নিহত অজ্ঞাতপরিচয়‌দের মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের কাজ শুরু ক‌রে। রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করা হয়েছে। 

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ও আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। 

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোল‌নে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নিহত বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। প‌রে নিহত‌দের পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন এবং শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডারের প্রত্যক্ষ দিক-নির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়। 

নিহত অজ্ঞাতদের পরিচয় শনাক্তের পর কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান বলেন, “জুলাই ১৫ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১১৪টি কবরের মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অজ্ঞাত নিহত ৯টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা আজ আটজনের পরিচয় শনাক্ত করেছি। আর একজন শহীদের নাম জিলানি। তার পরিবার সৌদি আরবের মদিনায় বসবাস করে। জিলানির জন্ম ও বেড়ে ওঠা মদিনায়। জুলাই আন্দোলনে ছুটিতে দেশে এসে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। টানা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি ৩ আগস্ট বনানী এলাকায় মারা যান। তার বোনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, কিন্তু ডিএনএ মেলেনি। আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এবার জিলানির ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আমরা আবার চেষ্টা করব।” 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অস্ট্রেলিয়ায় ৫ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করল মেটা

‘বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না’

আপডেট সময় : ০৬:০৮:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মদবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৮)। জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারান এই ব্যবসায়ী। পরিচয় না পাওয়ায় তাকে দাফন করা হয় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে। দাফনের দীর্ঘ দেড় বছর পর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে সোহেলের। অবশেষে তার কবর বুঝে পেয়েছে স্বজনেরা। 

কবর বুঝে পাওয়ার পরই কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহেলের মা রাশেদা বেগম। ছেলের নানা স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাবা তুই আমাকে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।” 

সোমবার (৫ জানুয়ারি) সোহেল ছাড়াও আরও সাতজনের কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাদের স্বজনদের। এ সময় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ ও অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। 

দীর্ঘ এক মাসের চেষ্টায় ডিএনএ’র মাধ্যমে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা এই আটজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বজনরা প্রিয় সন্তানের কবর বুঝে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের কবর পেয়ে কাউকে পানি দিতে দেখা যায়। আবার কাউকে মাটি ছুঁয়ে, কাউকে কবরে লাগানো গাছে হাত বুলাতেও দেখা যায়। 

সোহেল রানা ছাড়াও পরিচয় শনাক্ত হওয়ারা হলেন— মাদারটেক এলাকায় প্রাণ হারানো কাবিল হোসেন (৫৮), উত্তরায় নিহত আসাদুল্লাহ (৩১), রফিকুল ইসলাম (৫২) ও ফয়সাল সরকার (২৬), বাড্ডায় নিহত পারভেজ ব্যাপারী (২৩), যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত রফিকুল ইসলাম (২৯) এবং মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিম (৩২)। 

এর আগে সিআইডির উদ্যোগে জুলাই আন্দোল‌নে নিহত অজ্ঞাতপরিচয়‌দের মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের কাজ শুরু ক‌রে। রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করা হয়েছে। 

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ও আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। 

২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোল‌নে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নিহত বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। প‌রে নিহত‌দের পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন এবং শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডারের প্রত্যক্ষ দিক-নির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়। 

নিহত অজ্ঞাতদের পরিচয় শনাক্তের পর কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডি প্রধান বলেন, “জুলাই ১৫ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ১১৪টি কবরের মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অজ্ঞাত নিহত ৯টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা আজ আটজনের পরিচয় শনাক্ত করেছি। আর একজন শহীদের নাম জিলানি। তার পরিবার সৌদি আরবের মদিনায় বসবাস করে। জিলানির জন্ম ও বেড়ে ওঠা মদিনায়। জুলাই আন্দোলনে ছুটিতে দেশে এসে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। টানা আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি ৩ আগস্ট বনানী এলাকায় মারা যান। তার বোনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, কিন্তু ডিএনএ মেলেনি। আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এবার জিলানির ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আমরা আবার চেষ্টা করব।”